পবিত্র ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবস (২৬ মার্চ) সামনে রেখে কুমিল্লা জেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সূত্রে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীও সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের দাবি, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন। বর্তমানে বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের একটি অংশ আবার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। অনেকের পাসপোর্ট না থাকায় তারা অবৈধ পথ ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ভারত থেকে ফিরে আসা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নেতা বিদেশি অস্ত্রসহ দেশে প্রবেশ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লার সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্যের অর্থায়নে এসব অস্ত্র আনা হয়েছে। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, সাবেক অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), সাবেক এলজিইডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপন জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যার একাধিক মামলার আসামি। আন্দোলনের পর তিনি প্রথমে ভারতে পালিয়ে যান এবং পরে দুবাইয়ে আশ্রয় নেন।
অভিযোগ রয়েছে, গত শুক্রবার তিনি দেশে ফিরে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল গ্রামে নিজ বাড়িতে যান এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। কীভাবে তিনি দেশে ফিরলেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, তিনি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশে ফিরে সাজ্জাদ হোসেন স্বপন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আবার সংগঠিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। দিনের বেলায় চলাফেরা করলেও এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে তৃণমূল পর্যায়ে কিছু বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয় দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে এবং কয়েকজন আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এমনকি কয়েকটি ইফতার মাহফিলে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতাকে একসঙ্গে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী মোস্তাক মিয়া বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে কারো সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্পর্ক আছে কি না তা আমি জানি না। তবে দলীয়ভাবে তাদের প্রশ্রয় দিতে হবে—এমন কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই। তাদের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কাজ চলতে পারে না।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক ও কুমিল্লা জেলার প্রধান সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ বলেন, “আগেও অভিযোগ ছিল তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে গোপন সম্পর্ক আছে। আমরা এটার তীব্র নিন্দা জানাই। জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।”
অন্যদিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) রাশেদুল হক চৌধুরী বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র হত্যার মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাদের প্রচারণাও নিষিদ্ধ।”
সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে বিবির বাজার স্থলবন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করার সুযোগ নেই। আমরা খুবই সতর্ক অবস্থায় আছি।”
এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, “সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ প্রবেশ এবং অবৈধ অস্ত্র ও চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সবসময় সতর্ক রয়েছে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কাউকে পাওয়া যায়নি।”
আর/

