আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
পবিত্র কোরআন মুখস্থ, তিলাওয়াত ও তাফসিরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ৪৬তম আসর বসেছে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায়। সৌদি আরবের ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ছয় দিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৩৩টি দেশের ৩৩৪ জন নারী ও পুরুষ প্রতিযোগী অংশ নিয়েছেন। সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থা SPA জানিয়েছে, অংশগ্রহণের দিক থেকে এটি প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক দেশের প্রতিনিধিত্বকারী আসর।
এবারের আয়োজনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো—প্রতিযোগিতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী প্রতিযোগীদের জন্যও আলাদা বিভাগ চালু করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর এবারের ৪৬তম আসরেই প্রথম নারী প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রতিযোগিতাটি কোরআন হিফজ, তিলাওয়াত, তাজবিদ ও তাফসিরের দক্ষতাকে কেন্দ্র করে পাঁচটি বিভাগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাত কিরাআতসহ সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ, কোরআন মুখস্থের পাশাপাশি শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা, সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ এবং নির্ধারিত ১৫ ও পাঁচ পারা মুখস্থের বিভাগ।
প্রতিযোগীদের মূল্যায়নে কোরআন মুখস্থের দৃঢ়তা, তিলাওয়াতের শুদ্ধতা, তাজবিদ ও পরিবেশনার মানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় নম্বর প্রদানের নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে ইলেকট্রনিক জাজিং ব্যবস্থাও উন্নত করা হয়েছে।
পুরুষ প্রতিযোগীদের চূড়ান্ত পর্ব পবিত্র মসজিদুল হারামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নারী প্রতিযোগীদের জন্য নির্ধারিত পৃথক ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে তাদের চূড়ান্ত পর্ব।

সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় মূল পুরস্কার তহবিলের পরিমাণ ১০.২৬ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল, যা প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
পাঁচ বিভাগে মোট ৫০ জন বিজয়ী নির্বাচিত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রতিযোগীকে উৎসাহমূলক অর্থ দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আপনার দেওয়া তথ্যমতে, ৩৩৪ জন অংশগ্রহণকারীকে প্রত্যেককে ৫ হাজার সৌদি রিয়াল করে দেওয়া হলে এ বাবদ মোট অর্থ দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৭০ হাজার সৌদি রিয়াল।
তবে এখানে মূল পুরস্কার তহবিলের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহমূলক অর্থ আলাদাভাবে হিসাব করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশের আগে আয়োজক কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া সমীচীন।
সৌদি ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের মুসলিমদের কোরআন মুখস্থ, বোঝা ও তিলাওয়াতের প্রতি উৎসাহিত করা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে পবিত্র কোরআনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হিফজ ও তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাও আয়োজনটির লক্ষ্য।
সৌদি ইসলামবিষয়ক মন্ত্রী শেখ আবদুল লতিফ আল-শেখ প্রতিযোগিতাটির প্রতি সৌদি নেতৃত্বের সমর্থনের কথা তুলে ধরে কোরআন ও এর হাফেজদের প্রতি দেশটির বিশেষ যত্নের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের জন্য মক্কার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে তারা মক্কা ক্লক টাওয়ার মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন। সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান, সময় পরিমাপ এবং মক্কা ক্লকের সাংস্কৃতিক ও প্রকৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
চূড়ান্ত পর্ব শেষে কয়েকজন প্রতিযোগী মদিনায় পৌঁছে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি প্রকাশ করেন। পর্তুগালের প্রতিযোগী সারাহ সায়ানি সৌদি নেতৃত্বের প্রতি কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর কাছে এ সফর শুধু একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
রিইউনিয়নের প্রতিযোগী আমান বাতেল মক্কা ও মদিনার আধ্যাত্মিক পরিবেশের প্রশংসা করেন। মালদ্বীপের প্রতিযোগী মুসা আশরাফও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াকে তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির মাধ্যমে পবিত্র কোরআন পুনরায় ঝালাই করার সুযোগ পাওয়াকে তিনি বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেন।
এবারের আয়োজনের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ ৪৬তম বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় নারী বিভাগ যুক্ত করার অনুমোদন দেয়। সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে এ অনুমোদন দেওয়া হয় এবং এটিকে প্রতিযোগিতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এর ফলে চার দশকেরও বেশি সময়ের পুরোনো এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এবার প্রথমবারের মতো নারী ও পুরুষ—উভয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে।
প্রতিযোগিতাটির পুরস্কার কাঠামোও সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ২০২৪ সালের ৪৪তম আসরে মোট পুরস্কার ছিল ৪ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল।
২০২৬ সালের ৪৬তম আসরে সেই পুরস্কার তহবিল বেড়ে ১০.২৬ মিলিয়ন সৌদি রিয়ালে পৌঁছেছে বলে সৌদি সরকারি সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে ঘোষিত মূল পুরস্কার তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এবারের আসরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিসরে কোরআন হিফজ, তিলাওয়াত ও তাফসিরের প্রতিযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি নারী প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্তির নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে সৌদি আরব।
সূত্র: আরব নিউজ

