অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণে অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে করা মামলায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। মামলাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন রয়েছে।
মামলার বাদী ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আবদুচ ছামাদ জানিয়েছেন, তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান। সর্বশেষ গত ২৩ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও দুদক নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। পরে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আগামী ১১ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
মামলাটি ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দায়ের করা হয়। ওই দিন আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দুদককে দেয়।
এজাহারে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পরিচয় দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন হিসেবে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি এস আলম ও আবদুল ওয়াহেদের সমর্থনে নির্বাচিত পরিচালক ছিলেন। মামলার পর তার পরিচয় নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হলেও বাদী আবদুচ ছামাদ নিশ্চিত করেছেন, মামলার ১২ নম্বর আসামিই বর্তমান সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু।
তবে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, তিনি শুধু ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে তিনি আলাদা কোনো মন্তব্য করতে পারেননি।
মামলার অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালকসহ মোট ২০ জন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের নামে ইসলামী ব্যাংকের ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে এই বিনিয়োগের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। তাই পরিকল্পিতভাবে যোগসাজশের মাধ্যমে এ লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়, যাদের অনেকের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে শেয়ার কেনাবেচার তারিখ, অর্থের উৎস এবং মালিকানা স্থানান্তরের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে লেনদেনটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার পর অন্য আসামিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ক্ষেত্রে সে ধরনের আদেশ দেওয়া হয়নি।
শুধু ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ মামলাই নয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাত, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত নানা অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন মহলের দাবি, তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের দায়িত্ব পালনকালীন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।
সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়ে মো. সাহাবুদ্দিন এবং জেএমসি বিল্ডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনকে ঘিরে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তর, অর্থের উৎস এবং এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ড নির্দিষ্ট দায়মুক্তির আওতায় থাকলেও রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বা দায়িত্ব শেষে সংঘটিত কোনো অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সেই দায়মুক্তি প্রযোজ্য নয়। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আইন অনুযায়ী তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার কার্যক্রম সংবিধান অনুযায়ী সুরক্ষিত হলেও দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংঘটিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও জানিয়েছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নতুন কোনো তদন্ত শুরু না হলেও অতীতের কোনো ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকেও ভিন্নধর্মী বক্তব্য এসেছে। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, দুদক কমিশনার ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সে সময়ের জন্য তিনি সাংবিধানিক দায়মুক্তি ভোগ করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড মাত্র ৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে প্রায় ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার অধিগ্রহণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, এটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে জনগণের অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার ২৪টি কোম্পানির মাধ্যমে অধিগ্রহণ করা হয়, যাদের অনেকের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের তারিখ, অর্থের উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী সংস্থার কাছে পুরো প্রক্রিয়াটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দাবি, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং শেয়ার স্থানান্তরের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ জালিয়াতি, শেয়ার হস্তান্তর, করপোরেট সুশাসন এবং ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে একাধিক তদন্ত চলছে। এসব ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিএফআইইউ এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান ও বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইসলামী ব্যাংক-সংক্রান্ত অভিযোগগুলোও সেই বৃহত্তর তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

