নিম্নে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
📖 ১. কুরআন নাজিলের মাস
রমজানের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা এই যে, এ মাসেই মানবজাতির হেদায়াতের গ্রন্থ আল-কুরআন নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ
“রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে—মানবজাতির জন্য হেদায়াত এবং হেদায়াতের স্পষ্ট প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
“নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে।”
— সূরা আল-কদর, ৯৭:১
অতএব, রমজান হলো কুরআনের মাস। এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত, তাদাব্বুর ও আমলের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে আলোকিত করার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতি রমজানে হযরত জিবরাইল (আ.)-এর সাথে কুরআন দোর (পুনরালোচনা) করতেন—যা কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের শিক্ষা দেয়।
🕌 ২. তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ মাস
রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩
তাকওয়া অর্থ আল্লাহভীতি ও সচেতনতা। রোজা মানুষকে আত্মসংযম শেখায়—ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বান্দা বুঝতে শেখে, আল্লাহ সর্বদা তাকে দেখছেন। ফলে গোপন ও প্রকাশ্য উভয় অবস্থায় গুনাহ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
রমজান তাই শুধু উপবাসের নাম নয়; এটি চরিত্র গঠন ও নৈতিক শুদ্ধতার এক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
🌟 ৩. লাইলাতুল কদরের মহিমা
রমজানের সবচেয়ে মহিমান্বিত রাত হলো লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
— সূরা আল-কদর, ৯৭:৩
এক রাতের ইবাদত ৮৩ বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের চেয়েও উত্তম—এ এক অপূর্ব রহমত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ২০১৪
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৬০
এটি প্রমাণ করে যে, রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ।
🤲 ৪. রোজা ও গুনাহ মাফের সুসংবাদ
রমজানের রোজা গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৮
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৬০
অন্য হাদিসে এসেছে—
إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ
“রমজান এলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ১৮৯৯
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৭৯
এ থেকে বোঝা যায়, রমজান হলো নেক আমলের জন্য সর্বোত্তম পরিবেশ।
💞 ৫. দানশীলতা ও সামাজিক সহমর্মিতার মাস
রমজান দান-সদকার মাস। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ
“রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল ছিলেন, আর রমজান মাসে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে যেতেন।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬
ক্ষুধার কষ্ট অনুভবের মাধ্যমে ধনীরা গরিবের দুঃখ উপলব্ধি করেন। ফলে যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
✨ উপসংহার
মাহে রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি ঈমানি পুনর্জাগরণ, আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক সংস্কারের এক অনন্য সময়। কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করা, তাকওয়া অর্জন, গুনাহ থেকে তওবা করা এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার এ এক সুবর্ণ সুযোগ।
যদি আমরা রমজানের শিক্ষা সারা বছর ধারণ করতে পারি—তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে ইনশাআল্লাহ প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মাহে রমজানের যথাযথ হক আদায় করার তাওফিক দান করুন।
আমিন।
পবিত্র মাহে রমজানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য : ফাতীহ মুহাম্মাদ সোলাইমান
মাহে রমজান ইসলামের দৃষ্টিতে এক মহিমান্বিত ও বরকতময় মাস। এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য অগণিত কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করা এবং সমাজে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য রমজান একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণকাল।
৩২
