আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ অনুযায়ী, বিশ্বের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাত্র ১০টি দেশে বসবাস করছে—যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগেছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনে। এর মধ্যে শুধু সুদান, নাইজেরিয়া ও কঙ্গোতেই মোট আক্রান্ত মানুষের এক-তৃতীয়াংশ অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চরম জলবায়ু পরিস্থিতি। যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, ফলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যা, খরা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। বরং অনেক দেশে খাদ্য সংকট আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তবে কিছু দেশে, যেমন বাংলাদেশ ও সিরিয়ায়, পরিস্থিতির আংশিক উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর পেছনে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
অন্যদিকে আফগানিস্তান, কঙ্গো ও মিয়ানমারে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সংঘাত এবং অর্থনৈতিক সংকট খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। উন্নয়ন সংস্থা ও মানবিক সহায়তা কমে গেলে সংকটাপন্ন দেশগুলোর মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান আলভারো লারিও বলেছেন, রোপণের মৌসুমে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তিনি স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বাড়ানো, মাটির গুণগত মান উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল ফসলে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু জরুরি সহায়তা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কৃষি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তা এবং জলবায়ু সহনশীল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এখন একটি বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
আর/

