অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
সুখ—মানুষের জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অথচ সবচেয়ে অধরা অনুভূতিগুলোর একটি। অর্থ, সাফল্য, সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের পরও অনেকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত প্রশান্তি স্থায়ী হয় না। কেউ সুখ খোঁজেন আর্থিক স্বচ্ছলতায়, কেউ পরিবার ও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে, আবার কেউ নিরাপদ ও স্বাধীন জীবনের প্রত্যাশায়। শেষ পর্যন্ত সুখের ধারণাটি ব্যক্তির জীবনযাপন, সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে।
এই বাস্তবতাই আন্তর্জাতিকভাবে তুলনা করার চেষ্টা করে World Happiness Report। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ১৪৭টি দেশের মানুষের জীবনমূল্যায়ন বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের সুখের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের র্যাংকিং মূলত মানুষের নিজের জীবনকে ০ থেকে ১০-এর স্কেলে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের গড় জীবনমূল্যায়ন ব্যবহার করা হয়েছে এবারের তালিকায়।
সুখের তালিকায় ১২৭তম বাংলাদেশ
বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, ১৪৭ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭তম। বাংলাদেশের গড় জীবনমূল্যায়ন ৪.৩১৯। তালিকায় বাংলাদেশের নিচে রয়েছে আরও ২০টি দেশ। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ১০৪তম, ভারত ১১৬তম এবং শ্রীলঙ্কা ১৩৪তম অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থানকে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন কতটা নিরাপদ, তারা সামাজিকভাবে কতটা সহায়তা পান, নিজেদের জীবন সম্পর্কে কতটা নিয়ন্ত্রণ অনুভব করেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী—এসব বিষয়ও জীবনমূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান কেমন
২০২৬ সালের বৈশ্বিক সুখের তালিকার শীর্ষ ২০-এ কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নেই। তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে থাকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েত এগিয়ে রয়েছে। তবে মুসলিম বিশ্বের বড় একটি অংশ তালিকার মাঝামাঝি বা নিচের দিকে অবস্থান করছে।
এখানে অবশ্য ধর্মীয় পরিচয়কে সুখের সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। World Happiness Report-এর কাঠামোতেই দেখা যায়, মানুষের জীবনমূল্যায়নের সঙ্গে আয়, সামাজিক সহায়তা, সুস্থ জীবন প্রত্যাশা, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, উদারতা এবং দুর্নীতির ধারণার মতো বিষয়গুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোর অবস্থান সুখের সূচকে অনেক নিচে। ২০২৬ সালের তালিকায় আফগানিস্তান সর্বশেষ ১৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। ইয়েমেন ১৪২তম এবং লেবানন ১৪১তম। অন্যদিকে পাকিস্তান ১০৪তম, ফিলিস্তিন ১০৯তম এবং সোমালিয়া ১১৭তম।
ফলে মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গেলে ধর্মের চেয়ে দেশগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ-সংঘাত এবং নাগরিক জীবনের বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
টাকা থাকলেই কি সুখ আসে?
মানুষের সুখ নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো—আয় ও সম্পদ বাড়লে সুখও বাড়বে। বাস্তবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অবশ্যই মানুষের জীবনমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুখের সঙ্গে শুধু অর্থের সম্পর্ক নেই।
মানুষ অনেক সময় মনে করেন, আরও ভালো চাকরি, বড় বাড়ি, নতুন গাড়ি কিংবা বেশি আয় জীবনকে স্থায়ীভাবে সুখী করে তুলবে। কিন্তু একটি লক্ষ্য অর্জনের পর তা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যায় এবং সামনে চলে আসে নতুন প্রত্যাশা। ফলে শুধু বস্তুগত অর্জনের ওপর সুখকে নির্ভর করানো দীর্ঘমেয়াদে সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে না।
সুখের পেছনে সম্পর্কের বড় ভূমিকা
দীর্ঘমেয়াদি সুখ ও সুস্থতার ক্ষেত্রে সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বের কথাও উঠে এসেছে হার্ভার্ডের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়। Harvard Study of Adult Development প্রায় ৮৫ বছর ধরে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের বিভিন্ন দিক অনুসরণ করেছে। গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—যাদের অন্য মানুষের সঙ্গে উষ্ণ ও শক্তিশালী সম্পর্ক ছিল, তারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন।
অর্থাৎ জীবনের সাফল্যকে শুধু ব্যাংক ব্যালান্স, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক মর্যাদা দিয়ে মাপলে সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। পরিবার, বন্ধু, সামাজিক বন্ধন এবং প্রয়োজনের সময়ে পাশে থাকার মতো সম্পর্ক মানুষের সামগ্রিক ভালো থাকার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন আলোচনায়
২০২৬ সালের World Happiness Report-এর অন্যতম প্রধান বিষয়ই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সুখের সম্পর্ক। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের তরুণদের সুখ কমে যাওয়ার প্রবণতা এবং একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ব্যাপক বৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত জীবনের সাফল্য, আনন্দ ও আকর্ষণীয় মুহূর্তগুলোই বেশি প্রকাশ করেন। ফলে অন্যের নির্বাচিত সুন্দর মুহূর্তের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা তৈরি হতে পারে। তবে গবেষকেরা বিষয়টিকে সরলভাবে ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই সুখ কমাচ্ছে’—এমন একমাত্রিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ রাখেননি; এর প্রভাব ব্যক্তি, বয়স, সামাজিক পরিবেশ ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
শীর্ষে আবারও ফিনল্যান্ড
২০২৬ সালের World Happiness Report-এ টানা নবমবারের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ফিনল্যান্ড। এরপর রয়েছে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক ও কোস্টারিকা। সুইডেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, ইসরায়েল, লুক্সেমবার্গ ও সুইজারল্যান্ডও শীর্ষ দশে রয়েছে।
প্রতিবেদনটি মনে করিয়ে দেয়, একটি দেশের মানুষের সুখকে শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে বোঝা যায় না। মানুষের জীবন নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা, আস্থা ও সামাজিক সম্পর্কের মতো বিষয়ও জড়িয়ে থাকে।
বাংলাদেশের ১২৭তম অবস্থান তাই কেবল একটি র্যাংকিং নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও আশাব্যঞ্জক—সে বিষয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে আনে। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নাগরিকের জীবনমান, সামাজিক আস্থা, নিরাপত্তা এবং মানসিক প্রশান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি, সুখের এই বৈশ্বিক চিত্র সেই আলোচনাকেই আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

