গ্যাস সংকটে ৩০০ কারখানা বন্ধ, রপ্তানি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত: বিকেএমইএ

ইউরোপের ক্রেতারা প্রতিবেশী দেশে অর্ডার সরিয়ে নিচ্ছেন, দ্রুত সমাধান চান ব্যবসায়ীরা

by ABDUR RAHMAN
গ্যাস সংকটে ৩০০ কারখানা বন্ধ

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

দেশের শিল্পখাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের প্রভাব আরও গভীর হচ্ছে। গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় সারা দেশে তিন শতাধিক গার্মেন্ট কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তাঁর দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের রপ্তানি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

শনিবার (২২ আগস্ট) সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএ কার্যালয়ে গ্যাস সংকট ও এর প্রভাব নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রায় এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে সংকট চলছে। এর ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১০ আগস্টের পর পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। বরং সাময়িকভাবে দুই দিন কিছুটা সরবরাহ পাওয়ার পর আবারও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ছাড়া পোশাক কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে একদিকে সরাসরি উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্ডার যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশে

গ্যাস সংকটের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিকেএমইএ সভাপতি। বিশেষ করে ইউরোপের ক্রেতাদের একটি বড় অর্ডার ইতোমধ্যে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলে তিনি জানান।

হাতেমের ভাষ্য, নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়া তো দূরের কথা, বিদ্যমান অর্ডারগুলোও ধরে রাখা নিয়ে ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। উৎপাদন সময়মতো শেষ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারী দেশের দিকে ঝুঁকবেন—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংকটের কারণে এরই মধ্যে রপ্তানি খাতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। এর বাইরে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিলে দীর্ঘমেয়াদে যে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।

সরকারের কাছে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের দাবি

সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের আরও স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি। তাঁর মতে, শিল্পকারখানাগুলো কীভাবে উৎপাদন চালাবে এবং গ্যাস সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে—এ বিষয়ে সরকারকে নিয়মিতভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে অবহিত করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অন্তত সপ্তাহে একবার গ্যাস পরিস্থিতি ও সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে ব্রিফিং দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

ছয় দফা দাবি ব্যবসায়ীদের

বৈঠকে গ্যাস সংকট মোকাবিলা এবং শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের কাছে ছয়টি দাবি তুলে ধরেন ব্যবসায়ী নেতারা।

দাবিগুলো হলো—

১. জুন ও জুলাই মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। এ সময় বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলেও কোনো কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।

২. বর্তমান গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্পকারখানাগুলো কীভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।

৩. গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সংকট নিরসনে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রতি সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের ব্রিফ করতে হবে।

৪. শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক রাখতে গণপরিবহনে সিএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গ্যাসের অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।

৬. সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ঋণের কিস্তি আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিল্পখাতে সংকটের সাম্প্রতিক চিত্র

গ্যাস সংকট শুধু পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের নিম্নচাপ উৎপাদন ব্যাহত করছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে। বিকেএমইএ এর আগে জুলাই-আগস্টের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছিল। সংগঠনটির ভাষ্য, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে আংশিকভাবে সরবরাহ পুনরুদ্ধার হলেও আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে আবারও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।

১৫ আগস্ট পেট্রোবাংলা জানিয়েছিল, জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২,৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে এবং দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেই আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালে এলএনজি ফুরিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ আবার কমে যায়; পরবর্তী কার্গো ২৩ আগস্ট আসার কথা ছিল।

এদিকে গ্যাস সংকটের প্রভাব নিয়ে বিজিএমইএও এর আগে জানিয়েছে, পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে জ্বালানি সংকট এখন দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

বৈঠকে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম, সিনিয়র সহসভাপতি অমল পোদ্দার, সহসভাপতি মোর্শেদ সারওয়ার সোহেল ও আশিকুর রহমান, সাবেক বিজিএমইএ সভাপতি কাজী মনীরুজ্জামানসহ সংগঠনটির অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ