ফাতীহ মুহাম্মাদ সোলাইমান সম্পাদক, হুদহুদ নিউজ
এক লিটার ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু একটি লিটারের দামই বাড়ে না। সেই বাড়তি ব্যয় ধীরে ধীরে বাসের ভাড়া, পণ্য পরিবহন, কৃষকের সেচ, কারখানার উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে গিয়ে ঠেকে। এ কারণেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সিদ্ধান্তকে শুধু পেট্রোল পাম্পের মূল্যতালিকা দিয়ে বিচার করার সুযোগ নেই; দেখতে হবে এর অর্থনৈতিক বোঝা শেষ পর্যন্ত কার ওপর গিয়ে পড়ছে।
২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটেও ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণের নোটিশ প্রকাশের তথ্য রয়েছে।
সরকারের সামনে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে; ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের বড় ধরনের অস্থিরতা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব ফেলবেই। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপর লোকসানের চাপও বেড়েছে।
প্রশ্ন হলো—এই চাপ সামলানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কী, এবং তার বোঝা কীভাবে বণ্টিত হবে?
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—আমদানির ব্যয় বাড়লে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করিয়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরই এসে পড়ে।
এই যুক্তি অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু এর বিপরীত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে এর ব্যবহার রয়েছে। দামের বৃদ্ধি তাই শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিককে প্রভাবিত করে না; গণপরিবহন ব্যবহারকারী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তাও এর পরোক্ষ অংশীদার হয়ে যান।
দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬৪ শতাংশই ডিজেল; এর বড় অংশ পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বহু স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানেই নীতিনির্ধারণের দ্বিতীয় প্রশ্নটি সামনে আসে—রাষ্ট্রীয় লোকসান কমাতে গিয়ে ভোক্তার ওপর কতটা অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই চাপের প্রতিকার কী?
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় ফিলিং স্টেশনে। কিন্তু এর বড় প্রভাব তৈরি হয় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরে।
একটি পণ্য উৎপাদনের পর সেটি কারখানা থেকে পাইকারি বাজারে, সেখান থেকে খুচরা বাজারে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয় রয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়লে সেই ব্যয়ও বাড়ে। একইভাবে কৃষিতে সেচ ও যান্ত্রিকীকরণের খরচ বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান সতর্ক করেছেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনও বলেছেন, এর প্রভাব বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। তিনি একই সঙ্গে নিম্নআয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক ও গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অতএব, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু নতুন মূল্য কার্যকর করা নয়; বরং মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন মালিকেরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলতে পারেন। বাস্তব ব্যয় বাড়লে কিছু সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়েছে বলেই সব ধরনের পরিবহন ভাড়া একই অনুপাতে বাড়বে—এমন কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি নেই।
একটি বাসের মোট পরিচালন ব্যয়ের সবটাই জ্বালানি নয়। শ্রমিকের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, কর, ঋণের সুদসহ অন্যান্য ব্যয়ও রয়েছে। ফলে ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।
এখানে সরকারের দায়িত্ব হলো—পরিবহন মালিক ও যাত্রী—দুই পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তথ্যভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকানো। নইলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটি অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া বৃদ্ধির চক্র তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে কৃষি উৎপাদন সরাসরি সম্পর্কিত। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ, জমি প্রস্তুত, যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়তে পারে। এর একটি অংশ কৃষক বহন করবেন, আরেকটি অংশ বাজারে পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও যেন তিনি ন্যায্য বাজারমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন।
কৃষকের ব্যয় বাড়ল, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের নামে কৃষককে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হলো—এমন পরিস্থিতি হলে সংকট আরও গভীর হবে। তাই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে কৃষি উপকরণ, সেচ ব্যয় ও কৃষিপণ্যের বাজার—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মূল্যকে একটি কাঠামোর মধ্যে রাখা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নথিতেও এই স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকার ভিত্তিতে মূল্য সমন্বয়ের প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকলেই জনস্বার্থ নিশ্চিত হয় না। জনগণ জানতে চায়—আন্তর্জাতিক বাজারে কত দামে জ্বালানি কেনা হচ্ছে, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ কত, রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান কত, ভর্তুকির প্রয়োজন কত এবং নির্ধারিত খুচরা মূল্যে সরকারের প্রকৃত হিসাব কী।
এই তথ্যগুলো নিয়মিত ও সহজ ভাষায় প্রকাশ করা হলে মূল্য সমন্বয় নিয়ে জনআস্থাও বাড়বে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও দ্রুত তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। দাম বাড়ার সময় বিশ্ববাজারের যুক্তি এবং দাম কমার সময় অন্য যুক্তি—এ ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
সব ভোক্তাকে সমানভাবে ভর্তুকি দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। আবার কোনো সুরক্ষা ছাড়াই সব চাপ ভোক্তার ওপর স্থানান্তর করাও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিম্নআয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার মতো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোকে কীভাবে সাময়িক সহায়তা দেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি বা সুযোগসন্ধানী ব্যবসার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়ার সুযোগ নিয়ে কোনো পণ্যের দাম তার চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলে তার দায় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের চাপ বাস্তব। বাংলাদেশ সেই চাপ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। আবার রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপ কমানোর জন্য সব বোঝা একসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও টেকসই নীতি নয়।
নীতির সাফল্য তাই শুধু এই প্রশ্নে মাপা উচিত নয় যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় লোকসান কতটা কমানো গেল। একই সঙ্গে দেখতে হবে—পরিবহন ব্যয় কতটা বাড়ল, নিত্যপণ্যের বাজারে কী হলো, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়ল, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় কী প্রভাব পড়ল এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ কতটা তৈরি হলো।
জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা যদি প্রয়োজন হয়, সেটি হতে পারে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং তখনই শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব—মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কোথায় গিয়ে পড়ছে, তা শনাক্ত করা এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া।
কারণ জ্বালানি তেলের মূল্যতালিকা রাষ্ট্রের হিসাবের একটি অংশ মাত্র। একটি নীতির প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় মানুষের বাজারের ব্যাগ, কৃষকের উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের আয় এবং পরিবারের মাসিক বাজেটে তার প্রভাব দেখে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে তাই শুধু জ্বালানি আমদানির হিসাব নয়—জনজীবনের হিসাবটিও সমান গুরুত্বে রাখার প্রয়োজন।

