উষ্ণতার নতুন রেকর্ড ভাঙছে ‘গডজিলা’ এল নিনো: ৬ মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বিপুল প্রাণহানির শঙ্কা

সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বৈত প্রভাবে সেপ্টেম্বরের পর বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়ানোর পূর্বাভাস; সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়া।

by ABDUR RAHMAN
উষ্ণতার নতুন রেকর্ড ভাঙছে 'গডজিলা' এল নিনো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষাক্ত নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘এল নিনো’ যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চরম রূপ ধারণ করা এই ‘গডজিলা এল নিনো’র তাণ্ডবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি—এই ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে সাড়ে চার লাখেরও বেশি অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব’-এর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য সামনে আনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) নিশ্চিত করেছে যে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শতভাগ শক্তিতে এই এল নিনোর প্রভাব বজায় থাকবে, যার চরম ধাক্কা সামলাতে হবে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানি অস্বাভাবিক মাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীরা একে অত্যন্ত শক্তিশালী বা ‘গডজিলা-পর্যায়ের’ এল নিনো হিসেবে অভিহিত করছেন। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পটভূমিতে এই প্রপঞ্চের কারণে বিশ্বের স্থলভাগের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত চরম গরমের দিনের সংখ্যা প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাবে। এই দাবদাহের ফলে শুধু তাপজনিত মৃত্যুই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, অনিয়মিত দাবানল ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

গবেষণা অনুযায়ী, তাপদাহের এই মরণঘাতী রূপ সবচেয়ে তীব্র হতে যাচ্ছে এশিয়া ও আফ্রিকার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার মধ্যে একক দেশ হিসেবে শীর্ষে থাকা নাইজেরিয়ায় ৩১ হাজার ৪০০ এবং সুদানে সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটতে পারে।

অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০, ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোনের মতে, এয়ার কন্ডিশনিং বা আধুনিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও নিরবচ্ছিন্ন পানির অভাব থাকা নিম্ন আয়ের চরম ভাবাপন্ন এলাকাগুলোতেই মানবিক বিপর্যয় সবচেয়ে মারাত্মক হতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের আঁচ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বাংলাদেশও। পূর্বাভাস অনুযায়ী, উক্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে অন্তত ৬০০ জনের বেশি মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল চরম তাপদাহের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণার ডেটা মডেল নির্দেশ করছে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৬০০ প্রাণহানির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৩১০ জনই কেবল খুলনা অঞ্চলের। আউটডোর শ্রমিকে ভরা এই জনপদে চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত শীতল আশ্রয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞ অভিয়ন্ত তিওয়ারির মতে, কেবল তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করাই যথেষ্ট নয়, শ্রমিকদের সুরক্ষা ও জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি না নিলে এই বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ