মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে ভারতে। দেশটির প্রায় সব রাজ্যেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে মানুষকে, তবুও সময়মতো গ্যাস পাচ্ছেন না অনেকেই।
আমদানি ব্যাহত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্যাস সরবরাহে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে ভারত সরকার। এতে করে দেশের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও হোটেল শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের “সমতাভিত্তিক বণ্টন” নিশ্চিত করতে নতুন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং এলএনজি আমদানিতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ক্রেতা। একই সঙ্গে রান্নার গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতেও ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক। দেশটিতে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এর ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। এর সুযোগে ভারতে অনেক কোম্পানি এলপিজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও মূল্য বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবুও সঠিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
রাজধানী দিল্লিতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় সাত শতাংশ বেড়েছে। দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভও করেছেন।
তবে ভারতের জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি দাবি করেছেন, দেশে রান্নার গ্যাসের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, “রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির কোনো ঘাটতি নেই দেশে। একাধিক উৎস ও রুট দিয়ে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে।”
গ্রাহকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে।”
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
নতুন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সার কারখানা ও চা শিল্পের মতো কিছু খাত তাদের প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পাবে। অন্যদিকে ঘাটতি সামাল দিতে পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ আংশিক বা পুরোপুরি কমানো হতে পারে।
এরই মধ্যে ভারতের কয়েকটি সিরামিক ও টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
রেস্তোরাঁ ও হোটেল শিল্পও বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছে। ন্যাশনাল রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (এনআরএআই) জানিয়েছে, নতুন সরকারি নির্দেশনার পর অনেক এলপিজি সরবরাহকারী রেস্তোরাঁয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার ইঙ্গিত দিয়েছে। অথচ রেস্তোরাঁ খাত মূলত বাণিজ্যিক এলপিজির ওপরই নির্ভরশীল। এতে সরবরাহ বন্ধ হলে অধিকাংশ রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ ভারতের প্রযুক্তিনগর বেঙ্গালুরুর একটি হোটেল শিল্প সংগঠনের প্রধান পি. সি. রাও জানান, পরিস্থিতি ইতোমধ্যে সংকটজনক। তিনি বলেন, “অনেক ছোট রেস্তোরাঁয় মাত্র এক থেকে দুই দিনের গ্যাস মজুত আছে। আর বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ দিনের সরবরাহ রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের মেন্যু সীমিত করা বা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে।
আর/

