আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীকে বৈশ্বিক ‘কালো তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করার পরই এমন সিদ্ধান্তের কথা জানায় দেশটি।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জাতিসংঘকে ‘রাজনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছে, সংস্থাটি তার প্রতিষ্ঠাতা নীতিমালা থেকে সরে এসে পদ্ধতিগতভাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। মন্ত্রণালয় জানায়, গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ না হওয়া এবং নতুন মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের কার্যালয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখা হবে না।
জাতিসংঘের ‘কনফ্লিক্ট-রিলেটেড সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ২০২৬’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অন্তত ৩১টি যৌন নিপীড়নের ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই সংঘটিত হয়েছে ১৩টি ঘটনা। যাচাইকৃত ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ জন পুরুষ, ৭ জন নারী, ৯ জন বালক এবং ১ জন বালিকা; যাদের গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে আটক করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌনাঙ্গে আঘাত, জোরপূর্বক নগ্ন করা এবং ধর্ষণের হুমকি। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু পুরুষ বন্দির ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে, যার ফলে তারা দীর্ঘ সময় শারীরিক যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণে ভুগেছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পাননি।
মহাসচিব গুতেরেস প্রতিবেদনে জবাবদিহির অভাবের উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘সদে তেইমান’ সামরিক বন্দিশালায় এক ফিলিস্তিনি বন্দির ওপর সংঘটিত বহুল আলোচিত যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি তুলে ধরেন। সেখানে সিসিটিভি ফুটেজ ও চিকিৎসা নথি থাকার পরও অভিযুক্ত কয়েকজন ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা এই মহাসচিবের সঙ্গে আর কাজ করব না।” তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলকে হামাসের মতো সংগঠনের সঙ্গে একই তালিকায় রাখা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তার ভাষায়, “যে ব্যক্তি হামাস ও ইসরায়েলকে এক কাতারে দাঁড় করায়, সে তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়েছে।”
ড্যাননের দাবি, গত বছরের প্রতিবেদনে দেওয়া জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুসরণে ইসরায়েল সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট মামলার ভিত্তি উপস্থাপন না করেই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে ইসরায়েলকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি কূটনৈতিক সূত্রগুলোর অভিযোগ, সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমিলা প্যাটেনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মহাসচিব ব্যক্তিগতভাবে চাপ প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পৃথক এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, গুতেরেস তার মেয়াদের শেষ সময়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও মনগড়া অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে দায়িত্বের অপব্যবহার করছেন। তাদের দাবি, উত্থাপিত অভিযোগগুলো ইসরায়েল ইতোমধ্যেই স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকেই জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। এর আগে ২০২৪ সালে আন্তোনিও গুতেরেসকে ইসরায়েলে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও গভীর সংকটে পড়ল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আর/

