নিজস্ব প্রতিবেদক | হুদহুদ নিউজ
কুরআন ও হাদিসে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে নির্ধারিত মিরাস বা উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান পরিবর্তন, পুনর্নিরীক্ষণ কিংবা এর বিকল্প প্রবর্তনের কোনো সুযোগ নেই বলে ফতোয়া দিয়েছে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।
প্রতিষ্ঠানটির প্যাডে প্রকাশিত ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মানব রচিত আইন সমাজব্যবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে সংশোধনযোগ্য হতে পারে। কিন্তু যেসব বিধান কুরআন-হাদিসে আল্লাহ তাআলা ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোকে সামাজিক পরিবর্তনের অজুহাতে পুনর্নিরীক্ষণ বা সংশোধন করার সুযোগ নেই।
ফতোয়ায় কুরআনের সূরা মুলকের ১৪ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। ফলে মানুষের সামাজিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার কারণে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। ফতোয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোনো বিধানকে হেকমত, মাসলাহাত বা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের অজুহাতে সংশোধনযোগ্য মনে করা ‘সম্পূর্ণরূপে হারাম ও কুফর’।
ফতোয়াটিতে বিশেষভাবে মিরাস বা উত্তরাধিকার বণ্টনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, আল্লাহ তাআলা সন্তানদের উত্তরাধিকার সম্পর্কে নির্ধারিত অংশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। একজন কন্যা হলে তার অংশ অর্ধেক এবং দুই বা ততোধিক কন্যা হলে তাদের সম্মিলিত অংশ দুই-তৃতীয়াংশ। নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদের বিধানও হাদিসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাদ ইবনে রবী রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুই কন্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ফতোয়ায় বলা হয়, সাদ ইবনে রবী রাদিয়াল্লাহু আনহু উহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর তাঁর দুই কন্যা ও স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তাদের উত্তরাধিকার নিয়ে অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে মিরাসের আয়াত অবতীর্ণ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃতের দুই কন্যাকে দুই-তৃতীয়াংশ এবং তাদের মাকে এক-অষ্টমাংশ দেওয়ার নির্দেশ দেন। অবশিষ্ট সম্পদ মৃতের চাচাকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ফতোয়ায় সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নির্ধারিত অংশীদারদের তাদের অংশ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পদ নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের প্রাপ্য বলে নির্দেশনা রয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, কোনো ওয়ারিশ দরিদ্র, কিংবা কোনো ওয়ারিশ মৃত ব্যক্তির সন্তান-সন্ততির ভরণপোষণ করেন—এ ধরনের বিষয়কে মিরাস বণ্টনের মূল ভিত্তি বানানো যাবে না। কারণ কে মৃত ব্যক্তি ও তার সন্তান-সন্ততির জন্য বেশি উপকারী, তা মানুষ জানে না; আল্লাহ তাআলাই তা ভালোভাবে জানেন।
ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, মিরাসের বিধান আল্লাহর নির্ধারিত সীমার অন্তর্ভুক্ত। সূরা নিসার ১২-১৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এসব বিধান আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং এগুলো অমান্য করা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্যতার শামিল।
ফতোয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে জীবদ্দশায় সম্পদ ‘হেবা’ করার বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় এমনভাবে হেবা করলে যে, তার মৃত্যুর পর সেটি কার্যকর হবে, তাহলে নাম হেবা হলেও উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার দিক থেকে সেটি অসিয়তের পর্যায়ে পড়ে। আর কোনো ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত করা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও বাতিল। তবে সব ওয়ারিশ প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্মত হয়ে স্বেচ্ছায় সেই অসিয়ত বাস্তবায়ন করলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। ফতোয়ায় বর্ণিত হয়েছে, তিনি অসুস্থ অবস্থায় নিজের সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক আল্লাহর পথে সদকা করার অনুমতি চাইলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অনুমতি দেননি; এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সদকা করার অনুমতি দেন এবং সেটিকেও অধিক বলে উল্লেখ করেন।
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে বোঝা যায়—কেউ নিজের সম্পদ এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারবেন না, যার উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নির্ধারিত মিরাসের বিধান এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে করা এ ধরনের হেবা ‘স্পষ্ট হারাম’ বলে ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ফতোয়ায় শাসকদের দায়িত্ব সম্পর্কেও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শাসকদের দায়িত্ব জনগণকে আল্লাহ তাআলার দেওয়া বিধি-বিধানের ওপর পরিচালিত করা; আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজেদের তৈরি বিধান জারি করা তাদের দায়িত্ব নয়।
ফতোয়ার শেষাংশে বলা হয়েছে, কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত মিরাসের বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া গোমরাহী এবং এসব বিধানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দেওয়া বিধান মেনে নেওয়ার মধ্যেই সফলতা রয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

