অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত এলাকায় বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস) নির্মাণকে ঘিরে পরিবেশ ও আইনগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বন বিভাগ, পরিবেশবিদ এবং আইন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, শালবনের ভেতরে শিল্প, হাসপাতাল ও গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো তৈরি হলে বন, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রায় ৫ হাজার ২২ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শালবন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এ বনকে ঢাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। হরিণ, বুনো শূকর, বেজি, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাসস্থল এই বন নগরায়ণের চাপের মধ্যেও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সরেজমিন ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে বনের ভেতরে রাস্তা তৈরি করে বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ৭ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে নির্মাণাধীন এ স্থাপনার উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। পূর্ণ সক্ষমতায় এখানে প্রায় ২ হাজার টন পর্যন্ত বর্জ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। সংস্থাটির দাবি, নগরের ক্রমবর্ধমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের কেন্দ্র প্রয়োজন। তবে বন বিভাগের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তাদের বা পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি। পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়নি বলে দাবি করেছে বন বিভাগ।
বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগেও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাককে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলতে দেখা যায়। পরে এমন কর্মকাণ্ড আর হবে না বলে লিখিত অঙ্গীকার করা হলেও পরবর্তীতে আবারও একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়।
নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ এপ্রিল একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা উদ্যানের সীমানার কাছে নির্মাণকাজ শুরু করেন। বন কর্মকর্তারা অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তা দেখানো হয়নি। পরদিন রাতে এক্সকাভেটর দিয়ে সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভেঙে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধের চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী যৌথ পরিদর্শনে সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুন লাগানোর ঘটনাও শনাক্ত করা হয়।
এ ঘটনায় বন বিভাগ থেকে জেলা প্রশাসন, প্রধান বন সংরক্ষক, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের উল্লেখ করে বলা হয়, সংরক্ষিত বনের ভেতরে এ ধরনের নির্মাণ কার্যক্রম আইনবিরোধী।
পরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের নির্দিষ্ট তিনটি প্লটে শেড, রাস্তা, গভীর নলকূপসহ সব ধরনের নির্মাণকাজ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় ছয় মাসের জন্য বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়।
বেলার প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও জাতীয় উদ্যানের ভেতরে এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার মতে, সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশ রক্ষায় বিদ্যমান আইন যথেষ্ট এবং বিষয়টিতে আইন মেনে চলা জরুরি।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে না। বিকল্প সংকটের কারণেই এ স্থান নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভাওয়াল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পবর্জ্য, হাসপাতাল বর্জ্য, প্যাথলজিক্যাল বর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা, পলিথিন, সিরিঞ্জ ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান জমা হলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এসব বর্জ্যের কারণে বন্যপ্রাণীরা আক্রান্ত হতে পারে এবং খাবারের সঙ্গে বর্জ্য গ্রহণ করে মারা যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। একই সঙ্গে গভীর নলকূপ ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গিয়ে শালবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মতো সংরক্ষিত বনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো নির্মাণ শুধু পরিবেশগত নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও আইনের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদালতের নির্দেশনা, বন বিভাগের আপত্তি এবং সিটি করপোরেশনের প্রয়োজনীয়তার দাবি—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
আর/

