অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
দেশের মানুষের ভাত বা খাদ্যতালিকা কি তবে ধীরে ধীরে এক বিষম পানপাত্রে পরিণত হচ্ছে? একের পর এক বিদেশ থেকে নিম্নমানের, পচা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাখ্যাত খাদ্যশস্যের চালান আসার ঘটনায় এই প্রশ্নটি এখন তীব্রভাবে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারত থেকে সরকারিভাবে আমদানি করা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিপজ্জনক ছত্রাকজাত বিষ ‘আফলাটক্সিন’ পাওয়ার ঘটনায় যখন দেশজুড়ে , তখন সামনে এসেছে খাদ্য আমদানির এক দীর্ঘ ও শিউরে ওঠার মতো অনিয়মের খতিয়ান।
সর্বশেষ চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে (সিএসডি) রক্ষিত ১৩৫ টন চালে এই মরণঘাতী উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চালগুলো যখন বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিল, তখন প্রাথমিক ল্যাব পরীক্ষায় সেগুলোকে ‘খাওয়ার উপযোগী’ বলে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের জোরে বা পুনঃপরীক্ষার সুবাদে শেষ মুহূর্তে বিষয়টি ধরা পড়ায় রক্ষা মিলেছে; নতুবা এই বিষাক্ত চাল সরাসরি চলে যেত সাধারণ মানুষের পাতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন এমন আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি থেকে শুরু করে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধি হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
খাদ্য আমদানির কলঙ্কিত খতিয়ান ও অতীতের যত বিতর্ক:
-
ইউরোপে বাতিল হওয়া চাল আমদানির বিতর্ক (২০২৬): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র সামনে আসে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ক্ষতিকর উপাদান ও অতিরিক্ত কীটনাশকের কারণে পাকিস্তানের চালের একটি চালান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করে। অথচ সেই বাতিল চালই কম দামে বাংলাদেশে সরকারিভাবে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে।
-
ভারত থেকে আমদানিকৃত চালের চালান ফেরত (২০২৫): এর আগে সরকারি পর্যায়ে (জি টু জি) ভারত থেকে ১১, পঞ্চদশ বা ১১,৫০০ টনের একটি সেদ্ধ চালের চালান আনা হয়েছিল। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষায় তা অনুত্তীর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। জাহাজ থেকে সামান্য কিছু অংশ নামার পর বাকি চালের নিম্নমান ধরা পড়লে পুরো চালানটিই ভারতে ফেরত পাঠানো হয়।
-
পচা ও নষ্ট গম এবং চাল আমদানির পুরোনো ভূত: অতীতে ব্রাজিল কিংবা রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত গম ও চালে ক্ষতিকর পোকা, ছত্রাক ও পচা গন্ধ পাওয়ার বহু নজির রয়েছে। ল্যাব পরীক্ষায় সেগুলোর সত্যতা মিললে বন্দর থেকেই তা খালাস না করে সরাসরি জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ভেতরেও উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাদ্যশস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে প্রাকৃতিকভাবেই এমন আফলাটক্সিন জন্ম নিতে পারে।
শেষ রক্ষা কি শুধুই ভাগ্যের ওপর ভর করে?
বারবার কেন এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ও ক্ষতিকর খাদ্যপণ্য আমাদের বন্দরে এসে পৌঁছায় এবং প্রাথমিক পরীক্ষায় কীভাবে তা পাস হয়ে যায়—এই প্রশ্ন এখন কোটি টাকার। জনগণের কষ্টের টাকায় কেনা খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তাদের এমন উদাসীনতা অপরাধের শামিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল দায়সারা তদন্ত কমিটি গঠন বা দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রি-শিপমেন্ট ইনস্পেকশন বা জাহাজীকরণ পূর্ববর্তী মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্যথায় বিদেশ থেকে আসা খাদ্যশস্যের আড়ালে বিষক্রিয়ায় ধুঁকতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে।

