মহাকাশে ‘অন-অরবিট’ অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবার স্বীকার করল যুক্তরাষ্ট্র

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতা; কক্ষপথে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র থাকার কথা নিশ্চিত করলেন মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব

by ABDUR RAHMAN
মহাকাশে ‘অন-অরবিট’ অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবার স্বীকার করল যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত উত্তেজনার মধ্যেই মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিমানবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা ও সচিব ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, দেশটির স্পেস ফোর্সের কাছে কক্ষপথে মোতায়েনযোগ্য এমন অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে মার্কিন যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন
banner

সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজিত বার্ষিক এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ তথ্য জানান মেইঙ্ক।

তিনি বলেন, নতুন কোনো হুমকি যেখানেই তৈরি হোক না কেন, তা মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই সক্ষমতার অংশ হিসেবেই স্পেস ফোর্সের হাতে বর্তমানে কক্ষপথে মোতায়েন করা যায়—এমন অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে মার্কিন যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মেইঙ্ক অবশ্য কক্ষপথে মোতায়েন করা অস্ত্রগুলোর ধরন বা সুনির্দিষ্ট সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। প্রশ্নোত্তর পর্বেও তিনি এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বক্তব্যে ব্যবহৃত শব্দগুলো অত্যন্ত ভেবেচিন্তে নির্বাচন করা হয়েছে।

পরে মার্কিন স্পেস ফোর্সের পক্ষ থেকেও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন ‘স্পেস কন্ট্রোল’ সক্ষমতা রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মার্কিন যৌথ বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে পারে। এসব সক্ষমতা প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—উভয়ভাবেই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মেইঙ্কের বক্তব্যে যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তার মধ্যে এমন ব্যবস্থাও থাকতে পারে, যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করা সম্ভব।

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা নেই। ১৯৬৭ সালে স্বাক্ষরিত আউটার স্পেস ট্রিটি মহাকাশে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করেছে। তবে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করা, অকার্যকর করা বা ধ্বংস করার মতো বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা ওই চুক্তির সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকারোক্তি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি বহুপদক্ষেপের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। পরিকল্পনাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন আকাশপথের হুমকি থেকে সুরক্ষিত করা।

‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনাটি অনেকটা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ১৯৮৩ সালের স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘স্টার ওয়ার্স’ নামে পরিচিত ওই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির লক্ষ্যও ছিল মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি সীমিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র মোতায়েন করা হয়নি।

গত মার্চে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনার সমালোচনা করে এটিকে মহাকাশের সামরিকীকরণের উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, এই পরিকল্পনা কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে।

মহাকাশকে সামরিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা অবশ্য কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক উৎক্ষেপণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও মস্কো মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে অকার্যকর বা ধ্বংস করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে আসছে।

২০০০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া—এই চার দেশই বিভিন্ন সময়ে স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের নভেম্বরে রুশ সামরিক বাহিনী সোভিয়েত আমলের একটি অব্যবহৃত গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চীন ও রাশিয়া উভয়েই মহাকাশ ও কাউন্টারস্পেস সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। ওয়াশিংটনের মতে, চীন মহাকাশে সামরিক ও কাউন্টারস্পেস প্রযুক্তি উন্নত করছে। একইভাবে রাশিয়াও মহাকাশকে ভবিষ্যৎ সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে বলে মনে করে মার্কিন স্পেস ফোর্স।

এই পরিস্থিতিতে কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মহাকাশকে ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকায় মহাকাশে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতার বিস্তার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড, ওয়াশিংটন পোস্ট

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ