ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দেশ যখন স্পষ্ট ভাষায় এই হামলার নিন্দা জানায়, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কূটনৈতিক মহলে।
সরকারি ওই বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হলেও ইরানের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে হামলার জন্য দায়ী আমেরিকা ও ইসরায়েলের নামও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে এটি একটি “কারণহীন নিন্দা” হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিরপেক্ষতার পরিচয় নয়; বরং “selective caution” বা সুবিধাবাদী কূটনৈতিক আচরণ। প্রকৃত নিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় সব পক্ষের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থানকে অনেকেই দেখছেন একটি পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে।
এই অবস্থানের প্রভাব দ্রুতই দৃশ্যমান হয় বাস্তব ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের একটি জাহাজ ‘এম.ভি বাংলার জয়যাত্রা’ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে, যেখানে ৩১ জন নাবিক দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী এলাকায় চলাচল সীমিত করায় জাহাজটি গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় এবং বারবার ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
এর পাশাপাশি দেশে জ্বালানি সংকটও তীব্র আকার ধারণ করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহাজ চলাচলের অনুমতি চাওয়া হয়, যা কূটনৈতিক দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের পক্ষ থেকেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে জানায়, বাংলাদেশের কাছ থেকে আরও সুস্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সুসংহত দিকনির্দেশনার অভাব। জ্বালানি আমদানি, পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স—এই তিনটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
ফলে সিদ্ধান্তগুলো প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা না করে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক চাপের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠন করলেও বাংলাদেশ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানে রয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, স্পষ্ট কৌশলের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের ভুল নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। যেখানে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে, সেখানে এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও জনগণের ওপর।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: RealityCheck BD

