ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং পাল্টা উত্তেজনার জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং আমদানি নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একসঙ্গে কয়েকটি বড় চাপে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষিতে সেচ ব্যাহত হওয়া, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিল্প ও রপ্তানি খাতে চাপ—যা মিলিয়ে তৈরি হতে পারে এক ধরনের ‘পারফেক্ট ইকোনমিক স্টর্ম’।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। এই এলএনজির বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
আইইইএফএ-এর এশিয়া অঞ্চলের এলএনজি ও গ্যাস গবেষণা প্রধান স্যাম রেনল্ডস বলেন, “ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চার বছর পরই আমদানি নির্ভর এশীয় অর্থনীতিগুলো আবারও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কয়েক দিনের মধ্যেই এশিয়াজুড়ে তেল, এলএনজি ও কয়লার দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো।”
তিনি আরও বলেন, “এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশীয় ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া কতটা জরুরি।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান সংকট বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর ও ঋণচাপে থাকা জ্বালানি খাতের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি ব্যয়, ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।”
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, “হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে। বাংলাদেশের প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী কাতার ও ওমান। সংকট দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে গ্যাস সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।”
তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আইইইএফএ-এর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, “সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে রেশনিং করতে হতে পারে।”
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫ ডলারের বেশি হয়েছে। একই সময় ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির মূল্য ব্রেন্ট তেলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এতে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে বোরো ধান চাষের মৌসুম চলছে, যেখানে সেচের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন বা বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং বোরো উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে আপাতত সীমিত সময়ের জন্য জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে। অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে চলাচল করছে, যার ফলে পণ্য পরিবহনে সময় ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ নামে অতিরিক্ত বিমা খরচ যুক্ত হওয়ায় পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে। তারা মনে করেন, সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ালে ভবিষ্যতে এমন বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা থেকে বাংলাদেশকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
আর/

