জ্বালানি সংকটে থমকে ঢাকা: কমেছে গাড়ি, বেড়েছে ভাড়া—চরম ভোগান্তিতে নগরবাসী

by ABDUR RAHMAN

দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়েছে রাজধানীসহ সারাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায়। ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতির কারণে সড়কে বাস, মিনিবাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, বিশেষ করে অফিস শুরু ও ছুটির সময় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাসের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আধা ঘণ্টা থেকেও বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, তবুও কাঙ্ক্ষিত বাস পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব বাস চলছে, সেগুলো যাত্রীতে ঠাসা থাকায় ওঠার সুযোগও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে রিকশা বা রাইড শেয়ারিংয়ের মতো ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবহার করছেন।

বিজ্ঞাপন
banner

পল্টনে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আগে ৫ থেকে ১০ মিনিটে বাস পেতাম, এখন আধা ঘণ্টার বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে ওঠাই যায় না।”

একই চিত্র দেখা গেছে কাকরাইল এলাকাতেও। শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, “বাস এত কম আর ভিড় এত বেশি যে ঠিক সময়ে ক্লাসে পৌঁছানো খুব কঠিন হয়ে গেছে।”

জ্বালানি সংকটের কারণে গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক পরিবহন মালিক প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের গাড়ির অর্ধেকও রাস্তায় নামাতে পারছেন না। আগে যেখানে একটি বাস দিনে একাধিক ট্রিপ দিতে পারত, এখন সেখানে ট্রিপ সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

একজন চালকের সহকারী বলেন, “আমাদের মাত্র ২০ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। আগে দিনে ছয় ট্রিপ দিতে পারতাম, এখন সারাদিনে একটা ট্রিপ দিতে পারি।”

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শহরের বাস চলাচল ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দূরপাল্লার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা—অনেক রুটে বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রুটে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম বাস ছাড়ছে। এতে যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন।

অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া কোথাও কোথাও তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আগে ঢাকা থেকে ১৫ হাজার টাকায় পণ্য পাঠানো যেত, এখন ৪৫ থেকে ৪৮ হাজার টাকা লাগছে।”

শুধু সড়ক নয়, নৌপথেও এর প্রভাব পড়েছে। অনেক রুটে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাত্রীদের স্বল্প দূরত্ব পাড়ি দিতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে।

চালকদের দুর্ভোগও কম নয়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তাদের কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে এবং আয় কমে যাচ্ছে।

এক চালক জানান, “সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও বিকেল পর্যন্ত তেল পাইনি। এভাবে কাজ করা খুব কঠিন।”

জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমে গেছে। অনেকেই এখন মেট্রোরেল বা গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে ঢাকার সড়কে যানজট কিছুটা কমলেও যাত্রীদের কষ্ট বেড়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “জ্বালানি সংকটের পর ব্যক্তিগত পরিবহন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমেছে এবং গণপরিবহন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। এতে মানুষের ভোগান্তি অনেক বেড়েছে।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দাম, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ