ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে পত্নীসহ আটকের ঘটনার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় সামরিক ইউনিট—ডেল্টা ফোর্স।
প্রকাশ্যে খুব কম আলোচনায় আসা এই বাহিনীটি সাধারণ সেনাদল বা কমান্ডো ইউনিটের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্রপ্রধান আটক, সরকার উৎখাত বা শত্রুপক্ষকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করার মতো অভিযানে এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়।
ডেল্টা ফোর্সের আনুষ্ঠানিক নাম ফার্স্ট স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট–ডেল্টা (1st SFOD-D)। ১৯৭৭ সালে এটি গঠন করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে এর ঘাঁটি। বাহিনীটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (JSOC)–এর অধীনে পরিচালিত হয়। সন্ত্রাস দমন, জিম্মি উদ্ধার, রাষ্ট্রপ্রধান আটক বা নিধন এবং গোপন আন্তর্জাতিক অভিযানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের শেষ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত।
ডেল্টা ফোর্সকে এত ভয়ংকর বলা হয় মূলত তাদের কাজের ধরন ও গোপনীয়তার কারণে। এই বাহিনীর কোনো নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম নেই। অভিযানের সময় তারা সাধারণ পোশাকে, স্থানীয় নাগরিকের ছদ্মবেশে কিংবা শত্রুপক্ষের বাহিনীর মতো সেজেও কাজ করতে পারে। বাহিনীর সদস্যসংখ্যা, পরিচয়, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতায় রাখা হয়।
ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা শুধু শারীরিকভাবে প্রশিক্ষিত নন, মানসিক দৃঢ়তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার দিক থেকেও তারা বিশ্বের সেরা। ড্রোন নজরদারি, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, সাইবার হ্যাকিং, নাইট ভিশন অস্ত্র ও নির্ভুল স্নাইপার ব্যবস্থায় তারা অভ্যস্ত। কোনো অভিযানের আগে মাসের পর মাস তথ্য সংগ্রহ ও লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিখুঁত নজরদারি চালানো হয়।
এই বাহিনীর কুখ্যাতির বড় অংশ জড়িয়ে আছে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের সঙ্গে। ২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ অজুহাতে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে খুঁজে বের করা, আটক এবং ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে ডেল্টা ফোর্স ছিল প্রধান ভূমিকার নায়ক।
সাদ্দামকে ধরার অভিযানের পর ইরাক কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। গৃহযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জঙ্গিবাদের উত্থানে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল এবং ডেল্টা ফোর্সের মতো বাহিনীর আগ্রাসী ভূমিকা বড় দায় বহন করে।
শুধু ইরাক নয়—ডেল্টা ফোর্সের নাম জড়িয়ে আছে আইএস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি নিধন, আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় গোপন অভিযান এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন নাগরিক উদ্ধারের সঙ্গে। যেখানে কূটনীতি ব্যর্থ হয়, সেখানেই এই বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়।
নিকোলাস মাদুরোকে আটকের অভিযানে ডেল্টা ফোর্স ব্যবহারের বিষয়টি তাই সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট শক্তি প্রদর্শন। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ধরতে এই বাহিনী ব্যবহার করার অর্থ হলো—যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচার উপেক্ষা করতেও প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডেল্টা ফোর্স কেবল একটি সামরিক ইউনিট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য কায়েমের এক ভয়ংকর হাতিয়ার। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন থেকে শুরু করে আজ ভেনেজুয়েলার মাদুরো—এই বাহিনীর ইতিহাস জুড়ে রয়েছে ধ্বংস, বিতর্ক এবং রক্তক্ষয়ী অভিযানের ছাপ।
এনএএস/

