অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়, বরং এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি—যার মধ্যে এটি প্রবেশ করে, সে-ই ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাসূল (সা.)-এর নীতি ও আদর্শ’ শীর্ষক সেমিনার ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জাতীয় সীরাত উদযাপন কমিটি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে মানুষ আর কাউকে ফ্যাসিবাদের পথে চলতে দেবে না। ২০২৪ সালে যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিলেন, তারা সবাই হারিয়ে যাননি। অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণ ভবিষ্যতেও সোচ্চার হবে। ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে না ওঠা পর্যন্ত জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, দলটি নানা অপকর্মের কারণে দেশের ভেতরে স্থির থাকতে পারেনি এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তার দাবি, ইতিহাসে যারা অপকর্মের দায় নিয়ে পালিয়ে যায়, তারা আর ফিরে আসতে পারে না। তিনি অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শাসক নিজে দেশ ছাড়ার আগে তার আত্মীয়-স্বজনদেরও দেশ ছাড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, ওই আন্দোলনকে কেউ যেন ‘ফাইনাল যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা না করেন। তার ভাষায়, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল কেবল একটি ‘রিহার্সেল’। তিনি বলেন, ওই সময়ে জেগে ওঠা মুক্তিকামী মানুষ এখনো সজাগ এবং দেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
জুলাই জাদুঘর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, সেখানে পতিত সরকারের আমলে সংঘটিত জুলুমের তুলনায় বাস্তব চিত্রের খুব সামান্য অংশই তুলে ধরা হয়েছে এবং বিশেষ একটি দেশকে সন্তুষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য ও স্মৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্মৃতি ও উপাদানও বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তে ফেলানী হত্যার ছবি এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের ওপর রিমান্ডে চালানো নির্যাতনের ছবিও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতায় গিয়ে তারাও ইতিহাস বিকৃত করেছে এবং করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্র সংস্কারে রাসূলের নীতি অনুসরণের আহ্বান
সেমিনারে ইসলামকে শান্তি, ঐক্য ও সমন্বয়ের ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। কোরআনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ শান্তি ও শৃঙ্খলা পেয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ ইসলামের বাংলাদেশ হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, মহানবী (সা.)-এর নীতি ও আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তার মতে, ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পর্যন্ত নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তিনি বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে সম্মান না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, এর অন্যতম কারণ নৈতিকতার ঘাটতি। তার দাবি, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের ভাবমূর্তিও পরিবর্তিত হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, মদিনা সনদের আদর্শে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির কোনো স্থান নেই। অথচ মদিনা সনদের আলোকে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পরও অনেকের বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ে দেশে দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিরোধীদলে থাকাকালে অনেক রাজনৈতিক দল ইনসাফ ও ন্যায়ের কথা বললেও ক্ষমতায় গিয়ে ভিন্ন ভূমিকা নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আ ন ম রফিকুর রহমান মাদানী, জাতীয় সীরাত উদযাপন কমিটির সমন্বয়ক ড. আব্দুল মান্নানসহ অন্যরা।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম আবদুল কাদের। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় দুই গ্রুপের বিজয়ী ২০ জনের হাতে পুরস্কার ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

