আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
পবিত্র নগরী মক্কাকে রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তুলেছেন ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে হুথিদের মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টার অভিযোগের পর বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি এ দাবি করেন।
প্রায় এক ঘণ্টার ভাষণে আল-হুথি সৌদি আরবের অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ ও ‘প্রচারমূলক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, হুথিরা মক্কার পবিত্রতা লক্ষ্য করে কোনো হামলার চেষ্টা করেনি। বরং ইয়েমেনে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সৌদি আরব মক্কার পবিত্রতাকে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, হুথিদের ছোড়া একটি ড্রোন মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সৌদি প্রতিরক্ষা বাহিনী সেটি মক্কার আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করে। পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা সৌদি আরবের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও দেশটির কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে। তবে ড্রোনটি মক্কাকে লক্ষ্য করেই পাঠানো হয়েছিল—সৌদি এই দাবির সত্যতা হুথি নেতা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
আল-হুথি তাঁর বক্তব্যে ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক তৎপরতার কারণে হুথিদের বর্তমান সামরিক কর্মকাণ্ড আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইয়েমেনকে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যেই সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে।
হুথি নেতা আরও অভিযোগ করেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব শক্তি সৌদি আরবের রাজনৈতিক অবস্থান ও সামরিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও ব্যাখ্যা ভিন্ন।
মক্কা নিয়ে এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েফে একটি হুথি ড্রোন প্রতিহত করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হন বলে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহত ব্যক্তি ইয়েমেনি নাগরিক এবং আহতদের মধ্যে একজন সৌদি নাগরিক ও একজন পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই দিনে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দাবি, তায়েজসহ ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিরা উল্লেখযোগ্য সামরিক চাপের মুখে রয়েছে।
আল-হুথি তাঁর ভাষণে মুসলিম বিশ্বের প্রতি ইয়েমেনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মক্কার পবিত্রতাকে রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন।
মক্কাকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এমন সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন ইয়েমেনে কয়েক বছরের তুলনামূলক বিরতির পর আবারও সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হামলা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাব শুধু সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই; লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও সামনে এসেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সাম্প্রতিক হুথি হামলার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের সঙ্গে করা মক্কা চুক্তি কার্যকর করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন। এতে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশের নিরাপত্তা-সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর সৌদি অভিযোগ এবং সেটি প্রত্যাখ্যান করে হুথি নেতার বক্তব্য—দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী দাবি নিয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো সীমিত। ফলে ঘটনাটি ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স

