জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দান: আইন, শরিয়াহ ও উত্তরাধিকারের জটিল প্রশ্ন

বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে আল্লাহ নির্ধারিত হেবা ও মিরাসের বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করা যাবে না

by Master Fatih
জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে কুরআন-হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
ফাতীহ মুহাম্মাদ সোলাইমান
সম্পাদক, হুদহুদ নিউজ

সম্পত্তি মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কিন্তু একজন মুসলমানের কাছে সম্পত্তি কেবল অর্থনৈতিক মালিকানার বিষয় নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই সম্পত্তি নিয়ে মানুষের ইচ্ছারও একটি সীমা আছে। জীবিত অবস্থায় মানুষ নিজের সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন, হেবা করতে পারেন; কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি কারা পাবেন, কতটুকু পাবেন—এটি মানুষের পছন্দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তাআলা নিজেই তার বিধান নির্ধারণ করেছেন।

এই মৌলিক পার্থক্যটি সামনে রেখেই ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা দেখতে হবে। ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া এই সংশোধনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আত্মীয়ের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারাধিকার সংরক্ষণের আইনি ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তার প্রয়োজন বাস্তব। সন্তান সম্পত্তি নিয়ে নেওয়ার পর বাবা-মাকে অসহায় অবস্থায় ফেলবে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এমন একটি সম্পত্তি-ব্যবস্থা তৈরি করা যাবে কি না, যার সঙ্গে শরিয়াহর হেবা, কবয ও মিরাসের বিধানের মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে যায়।

আমার অবস্থান পরিষ্কার: মুসলমানের জন্য কুরআন ও সহিহ সুন্নাহই চূড়ান্ত মানদণ্ড। মানুষের তৈরি কোনো আইন, সামাজিক প্রয়োজন কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধানের বিকল্প হতে পারে না।

মিরাসের বিধান আল্লাহর নির্ধারিত

মিরাসের ক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থান অন্য অনেক সামাজিক আইনের মতো নয়। আল্লাহ তাআলা সূরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করেছেন। এরপর ১৩ নম্বর আয়াতে বলেন, এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।

অর্থাৎ কে কতটুকু উত্তরাধিকার পাবেন—এটি কোনো পিতা, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র নিজের সুবিধামতো নির্ধারণ করবে না।

আর ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন।

এখানে বিষয়টি অত্যন্ত মৌলিক। উত্তরাধিকারব্যবস্থা যদি আল্লাহ তাআলা নিজেই নির্ধারণ করে দেন, তাহলে মানুষের তৈরি কোনো ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়, যা কার্যত সেই নির্ধারিত অধিকারকে এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুলে দেয়।

এ কারণে হেবা ও মিরাসের পার্থক্য বোঝা অপরিহার্য।

হেবা মানে শুধু দলিলে নাম লিখে দেওয়া নয়

ইসলামে হেবা বৈধ। একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর মালিকানাধীন সম্পদ অন্যকে হেবা করতে পারেন। কিন্তু হেবার নিজস্ব শরয়ী কাঠামো আছে।

হানাফি ফিকহে হেবার ক্ষেত্রে ইজাব, কবুল ও কবযের গুরুত্ব মৌলিক। অর্থাৎ শুধু মুখে ঘোষণা কিংবা কাগজে নাম লিখে দেওয়াই সবসময় হেবাকে পূর্ণ করে না; গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও রয়েছে।

এখানেই বর্তমান আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী প্রশ্নটি সামনে আসে।

একজন পিতা যদি সন্তানকে সম্পত্তি ‘হেবা’ করেন, কিন্তু একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারাধিকার নিজের কাছে রাখেন, তাহলে প্রশ্ন হলো—গ্রহীতার কবয কোথায়?

দাতা সম্পত্তি ছাড়ছেন না। গ্রহীতাও সম্পত্তির ওপর পূর্ণ স্বাধীন তাসাররুফ করছেন না। তাহলে হেবার শরয়ী পূর্ণতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?

এটি কেবল আইনগত মালিকানার প্রশ্ন নয়। এটি হেবার শরয়ী প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন।

কাগজের মালিকানা ও শরয়ী কবয এক নয়

আধুনিক আইনে রেজিস্ট্রেশন মালিকানা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু শরিয়াহর ফিকহি কাঠামোয় রেজিস্ট্রেশন এবং কবযকে এক করে দেখা যায় না।

কবযের উদ্দেশ্য হলো গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির ওপর কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়া। আধুনিক ইসলামি ফিন্যান্সের আলোচনাতেও কবযে হাকিকি ও কবযে হুকমির ধারণা রয়েছে। কিন্তু কবযে হুকমির ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্ন থাকে—গ্রহীতা কি বাস্তবে সম্পত্তির ওপর তাসাররুফ করার সক্ষমতা অর্জন করেছেন?

আলোচ্য ব্যবস্থায় যদি দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগ নিজের কাছে রাখেন এবং গ্রহীতার তাসাররুফের ওপরও সীমাবদ্ধতা থাকে, তাহলে এটিকে নিছক ‘কাগজে মালিকানা হস্তান্তর’ দিয়ে শরয়ী কবয হিসেবে ধরে নেওয়া অত্যন্ত সমস্যাজনক।

কারণ হেবা যদি শরয়ীভাবে সম্পন্নই না হয়, তাহলে মৃত্যুর সময় সম্পত্তিটি কার মালিকানাধীন ছিল—এই প্রশ্ন আবার সামনে আসবে।

আর মৃত্যুর সময় সম্পত্তি যদি দাতার মালিকানাধীন থাকে, তাহলে সেটি তাঁর মিরাসি সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রশ্ন তৈরি করবে।

অতএব হেবা সম্পন্ন না করেই হেবার ফলাফল ভোগ করার চেষ্টা করা যাবে কি না—এটাই এখানে মৌলিক প্রশ্ন।

মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্ত থাকলে হেবার প্রকৃতি বদলে যায়

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

হেবা হলো জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি প্রদান। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি সম্পত্তি অন্যের নামে লিখে দিয়ে এমন ব্যবস্থা করেন যে তাঁর জীবদ্দশায় গ্রহীতা কার্যকর অধিকার পাবেন না এবং মৃত্যুর পর সেটির পূর্ণ ফল ভোগ করবেন, তাহলে সেটি কেবল ‘হেবা’ নামেই হেবা হয়ে যায় না।

কারণ মৃত্যুর সঙ্গে সম্পত্তি কার্যকর হওয়ার সম্পর্ক তৈরি হলে ওয়াসিয়তের প্রশ্ন সামনে আসে।

ওয়াসিয়তের নিজস্ব শরয়ী বিধান রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لا وصية لوارث»

অর্থাৎ, কোনো ওয়ারিশের জন্য ওয়াসিয়ত নেই।

হাদিসটির আলোকে ফকিহরা ওয়ারিশের জন্য ওয়াসিয়তের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান আলোচনা করেছেন। ফলে কোনো ওয়ারিশকে মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সম্পত্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এমন কাঠামো তৈরি করা যাবে না, যার মাধ্যমে ফারায়েজের নির্ধারিত অংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।

এখানে মূলনীতি হলো—নাম পরিবর্তন করলে শরয়ী হুকুম পরিবর্তন হয় না।

কোনো ব্যবস্থার নাম ‘হেবা’ হলেই সেটি শরয়ী হেবা হয়ে যাবে না; তার প্রকৃতি, শর্ত, কবয এবং কার্যকারিতা দেখতে হবে।

আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েজ পাশ কাটানোর পথ বন্ধ করতে হবে

একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর সম্পত্তি হেবা করতে পারেন—এটি স্বীকৃত। কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারব্যবস্থাকে ধ্বংস করার সুযোগ নেওয়া শরিয়াহর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কারও যদি উদ্দেশ্য হয়—মৃত্যুর পর তাঁর নির্দিষ্ট একজন সন্তানই যেন সম্পত্তিটি পায় এবং অন্য ওয়ারিশরা যেন বঞ্চিত হয়—তাহলে বিষয়টি নিছক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন থাকে না; এটি ফারায়েজ এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্নে পরিণত হয়।

কুরআন যখন উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে, তখন কোনো মুসলমানের দায়িত্ব হলো সেই বিধান মেনে চলা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।”
—সূরা আন-নিসা, ৪:১৩

সুতরাং মানুষের তৈরি কোনো আইনি কৌশল যদি সেই সীমা অতিক্রম করার হাতিয়ার হয়, তাহলে মুসলমানের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারও শরিয়াহর দাবি

হেবা শুধু ‘আমি আমার সম্পত্তি, যাকে ইচ্ছা দেব’—এই সরল যুক্তিতে শেষ হয়ে যায় না।

নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর ঘটনা এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পিতা তাঁকে বিশেষভাবে একটি দান করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তাঁর অন্য সন্তানদেরও একইভাবে দিয়েছেন? যখন উত্তর না হলো, তখন নবী ﷺ বললেন:

“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।”

এরপর তাঁর পিতা সেই দান ফিরিয়ে নেন। —সহিহ বুখারি

এখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ শুধু একটি পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা করেননি; বরং সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দিয়েছেন।

তাই কোনো আইনি কাঠামো এমনভাবে ব্যবহার করা হলে যাতে এক সন্তান সম্পত্তির বিশেষ সুবিধা পায় এবং অন্য সন্তানরা কার্যত বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই প্রয়োগকে শরিয়াহর ন্যায়বিচারের আলোকে অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।

‘উমরা’কে এই ব্যবস্থার সরাসরি নজির বলা যায় না

জীবনকালীন ভোগাধিকারের আলোচনায় হিবা উমরার উদাহরণ আনা হয়েছে। কিন্তু উমরা ও বর্তমান প্রস্তাবের কাঠামো এক নয়।

উমরার ক্ষেত্রে দাতা অন্য ব্যক্তিকে সম্পত্তির ওপর জীবনকালীন অধিকার দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। আর বর্তমান আলোচনায় দাতা মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করেও নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করছেন।

অর্থাৎ দুই ব্যবস্থায় মালিকানা ও ভোগাধিকারের সম্পর্ক এক নয়।

তার ওপর উমরার পর সম্পত্তি কার কাছে যাবে—এ নিয়েও ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুতরাং একটি ফিকহি আলোচনাকে তার পূর্ণ কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্তমান আইনের সরাসরি শরয়ী বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা সঠিক হবে না।

একইভাবে মালয়েশিয়ার ট্রাস্টভিত্তিক সম্পত্তি ব্যবস্থাকেও সরাসরি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে অভিন্ন বলা যাবে না। সেখানে ট্রাস্টের নিজস্ব কাঠামো, দায়িত্ব ও আইনগত সম্পর্ক রয়েছে।

বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে

এই জায়গায় একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।

এই আইনের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা। সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পর অনেক বাবা-মা বাস্তবে অসহায় হয়ে পড়তে পারেন। তাঁদের বসবাস, চিকিৎসা, ভরণপোষণ ও জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনগত সুরক্ষা প্রয়োজন—এ কথা অস্বীকার করার কারণ নেই।

কিন্তু ইসলামে প্রয়োজনের সমাধান খুঁজতে গিয়ে শরিয়াহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা যায় না।

অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—“মা-বাবাকে নিরাপদ রাখব, নাকি ফারায়েজ মানব?”

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“কীভাবে মা-বাবাকে নিরাপদ রাখা যায় এবং একই সঙ্গে হেবা ও ফারায়েজের শরয়ী বিধান অক্ষুণ্ন রাখা যায়?”

এটাই সঠিক প্রশ্ন।

সমাধান আইনকে শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা

আমার বিবেচনায় এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ১২২এ ও ১২২বি ধারাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শরয়ী ও আইনগত পর্যালোচনা করা।

প্রথমত, হেবা কখন শরয়ীভাবে সম্পন্ন হবে—আইন প্রণয়নের সময় এই প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার এবং গ্রহীতার মালিকানা—দুইটি অধিকার কীভাবে একসঙ্গে কার্যকর হবে, তার শরয়ী ভিত্তি স্পষ্ট করতে হবে।

তৃতীয়ত, কবয ছাড়া কেবল দলিলের ভিত্তিতে হেবা সম্পন্ন হয়েছে—এমন ধারণা মুসলিম নাগরিকের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা ফকিহদের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, কোনো মুসলমান যেন এই আইনকে ব্যবহার করে আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজ থেকে কোনো ওয়ারিশকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থা করতে না পারেন, সেই সুরক্ষা থাকতে হবে।

পঞ্চমত, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তার জন্য পৃথক শরিয়াহসম্মত ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁদের জীবনকালীন বসবাস, ভরণপোষণ ও ব্যবহারাধিকার রক্ষার এমন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যাতে হেবা ও মিরাসের বিধান পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে না যায়।

ষষ্ঠত, আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি, ফকিহ, দারুল ইফতা, শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

আমাদের সমস্যা ফারায়েজে নয়, ফারায়েজ বাস্তবায়নে

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিপুল জটিলতা রয়েছে, তার বড় অংশ কুরআনের বিধানের জটিলতা থেকে তৈরি হয়নি; বরং বিধান না মানা থেকে তৈরি হয়েছে।

বোনের অংশ দেওয়া হয় না। ফুফুর অধিকার অস্বীকার করা হয়। সম্পত্তি বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়। ভাই-বোনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। জমির রেকর্ড ও নামজারি জটিলতার কারণে উত্তরাধিকারীরা তাঁদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না।

তাই সমাধান ফারায়েজ পরিবর্তন নয়।

সমাধান হলো—ফারায়েজ বাস্তবায়ন সহজ করা।

সরকার চাইলে উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা করতে পারে। দ্রুত নামজারি ও খারিজের ব্যবস্থা করতে পারে। পরিবারকে উত্তরাধিকার সনদ ও সম্পত্তি বণ্টনের সহজ প্রক্রিয়া দিতে পারে। জনগণের মধ্যে ফারায়েজ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ আল্লাহর বিধানকে মানুষের সুবিধামতো পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই; মানুষের ব্যবস্থাপনাকে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের উপযোগী করে তুলতে হবে।

শেষ কথা: নিরাপত্তা চাই, কিন্তু শরিয়াহর সীমার ভেতরে

বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা একটি বাস্তব সমস্যা। তাঁদের সম্পত্তি সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার পর যেন তাঁরা অসহায় না হন, সে জন্য আইনি সুরক্ষা দরকার। কিন্তু সেই সুরক্ষার পথ এমন হতে পারে না, যা হেবা, কবয ও ফারায়েজের শরয়ী কাঠামোকে অস্পষ্ট করে দেয়।

কুরআন মিরাসের অংশ নির্ধারণ করেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ হেবা ও সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছেন। হেবা ও ওয়াসিয়তের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করেছেন শরিয়াহ। ফিকহ হেবার পূর্ণতার ক্ষেত্রে কবযের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

অতএব নতুন কোনো আইনি ব্যবস্থা এসব মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই প্রথম প্রশ্ন।

আমার কাছে মানুষের তৈরি কোনো আইনের চেয়ে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ঊর্ধ্বে। সুতরাং কোনো আইন যদি কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে মুসলমানের কর্তব্য সেই বিধানকে সমর্থন করা নয়; বরং আইনটিকে সংশোধনের দাবি তোলা।

এখানে তাই বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তার প্রয়োজনকে অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তার জন্য কি শরিয়াহর সীমা অতিক্রম করতে হবে?

উত্তর—না।

সমাধান এমন হতে হবে, যেখানে বাবা-মা তাঁদের জীবদ্দশায় নিরাপদ থাকবেন, সন্তান তাঁদের অধিকার ও দায়িত্ব পালন করবে, হেবা তার শরয়ী শর্তে সম্পন্ন হবে এবং মৃত্যুর পর আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজ তার পূর্ণ অধিকার নিয়ে কার্যকর হবে।

কারণ একজন মুসলমানের কাছে চূড়ান্ত প্রশ্ন হলো না—আইনটি মানুষের সুবিধাজনক কি না। চূড়ান্ত প্রশ্ন হলো—আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ যে সীমা নির্ধারণ করেছেন, আমরা সেই সীমার ভেতরে আছি কি না।

সেই সীমারেখাই রক্ষা করতে হবে।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ