নুসরাত হত্যা মামলায় সব আসামিকে ফাঁসির রায় দেওয়া বিচারকের ক্ষমতা প্রত্যাহারের নির্দেশ হাইকোর্টের

দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন; খালাস ১০ জন

by ABDUR RAHMAN
নুসরাত হত্যা মামলায় ‘ঢালাও’ ফাঁসির রায় দেওয়া বিচারকের ক্ষমতা প্রত্যাহারের নির্দেশ হাইকোর্টের

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বহুল প্রতীক্ষিত রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলার ১৬ আসামির মধ্যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বিজ্ঞাপন
banner

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো—২০১৯ সালে ১৬ আসামিকে একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহারের নির্দেশ। আদালত মনে করেন, নিম্ন আদালতের রায়ে প্রত্যেক আসামির পৃথক ভূমিকা ও সম্পৃক্ততা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। একই সঙ্গে ওই বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল

হাইকোর্ট যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন তারা হলেন—সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।

চারজনের সাজা কমে যাবজ্জীবন

মৃত্যুদণ্ড থেকে চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন—নূর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি।

খালাস পেলেন ১০ আসামি

হাইকোর্টের রায়ে খালাস পেয়েছেন রুহুল আমিন, মাকসুদুল আলম, হাফেজ আবদুল কাদের, আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল। আদালতের দৃষ্টিতে তাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যেভাবে হত্যার শিকার হন নুসরাত

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন নুসরাত। ওই ঘটনায় মামলা হওয়ার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযোগ ওঠে, মামলা প্রত্যাহার না করায় নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাকে কৌশলে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাত-পা বেঁধে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পূর্বসূরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

নিম্ন আদালতে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই সময় মামলাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

পরে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল ও জেল আপিল করেন। এসব আবেদন ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শেষে আজ চূড়ান্তভাবে রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্ট।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি

নারী ও শিশু নির্যাতনের আলোচিত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী গত ১০ জুন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন ও আপিল শুনানির জন্য বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেন। সেই বিশেষ বেঞ্চেই নুসরাত হত্যা মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

নুসরাত হত্যা মামলার আজকের রায়ে একদিকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আলোচিত দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকল, অন্যদিকে নিম্ন আদালতে একসঙ্গে ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাইকোর্টের কঠোর পর্যবেক্ষণ সামনে এলো। একই মামলায় চারজনের সাজা কমানো এবং ১০ জনের খালাসের মধ্য দিয়ে নিম্ন আদালতের রায়ের সঙ্গে উচ্চ আদালতের মূল্যায়নের বড় পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ