সরকারি সেবায় ঘুষ: দুই দিনেই ৮০৪ অভিযোগ, সবচেয়ে বেশি ঢাকায়

পরিচয় গোপন রেখে সরকারি সেবায় ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানানোর সুযোগ; সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ঢাকা বিভাগে

by ABDUR RAHMAN
সরকারি সেবায় ঘুষ

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায়, কোন সেবার জন্য এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—সেই অভিজ্ঞতা এক জায়গায় নথিবদ্ধ করতে চালু হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে প্রথম দুই দিনেই ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন
banner

‘ঘুষ.সাইট’-এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করেই সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। ওয়েবসাইটটির উদ্যোক্তা দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি অনুরূপ উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা বাংলাদেশের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন।

উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য, বিভিন্ন মানুষের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলো এক জায়গায় এনে কোন সরকারি দপ্তর বা সেবাকে ঘিরে কত ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা।

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ঢাকায়

উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দুই দিনে জমা পড়া ৮০৪টি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৩০টি ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৭, রাজশাহীতে ৪৪, খুলনায় ৪৩, সিলেটে ৩৮, রংপুরে ৩৭, ময়মনসিংহে ৩০ এবং বরিশালে ১৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

অভিযোগকারীদের মধ্যে ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন।

যেভাবে অভিযোগ করা যায়

ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকার তথ্য, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হয়। চাইলে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও যুক্ত করা যায়।

এ জন্য কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। পুরো প্রক্রিয়াটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা যায়। তবে কোনো ব্যক্তি, তাঁর পদবি কিংবা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

অভিযোগ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে দেওয়া হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা সাইটের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অভিযোগ বাদ দেওয়ার পর বাকি তথ্য প্রকাশ করা হয়।

‘অভিযোগ’, প্রমাণ নয়

‘ঘুষ.সাইট’-এ প্রকাশিত তথ্যকে যাচাই করা অভিযোগ বা আইনি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে না উদ্যোক্তারা। প্রতিটি প্রতিবেদনের সঙ্গে তা ‘আনভেরিফায়েড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প হিসেবেও কাজ করার দাবি করছে না। বরং সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষের ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতাগুলোকে একটি উন্মুক্ত রেকর্ডে পরিণত করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তাঁদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেয়ে কোন সরকারি দপ্তর বা সেবাকে ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেই প্রবণতা তুলে ধরাই গুরুত্বপূর্ণ।

নিজস্ব অর্থায়নে চলছে সাইট

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ‘ঘুষ.সাইট’ নিজেদের অর্থায়নেই পরিচালিত হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই এবং বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। তবে সাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।

উদ্যোক্তা সাইফ কবিরের মতে, কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে যদি বুঝতে পারেন কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটিই তাঁদের উদ্যোগের বড় সাফল্য।

২১ আগস্ট চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই শত শত অভিযোগ জমা পড়ার বিষয়টি প্ল্যাটফর্মটির প্রতি মানুষের আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অভিযোগগুলো যাচাই করা নয়—এটি মাথায় রেখেই ওয়েবসাইটের তথ্য ব্যবহার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দাবি, ভবিষ্যতে এসব তথ্য একত্রিত হলে সরকারি সেবা ও দপ্তরভিত্তিক ঘুষের প্রবণতা সম্পর্কে একটি জনসম্মুখের চিত্র তৈরি হতে পারে।

সরকারি সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য তথ্যের একটি উন্মুক্ত ডাটাবেস তৈরির ধারণাই ‘ঘুষ.সাইট’-এর কেন্দ্রবিন্দু। তবে কোনো অভিযোগকে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অভিযুক্ত করার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার না করে, যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ