ভারতের রায়গড়ে উৎসবের আগেই বন্যায় ধ্বংস হলো কোটি টাকার গণেশমূর্তি

রায়গড়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০ লাখ মূর্তি ও তিন হাজার কর্মশালা; সংকটে দেড় লাখের বেশি মৃৎশিল্পীর জীবিকা, বিলম্ব হতে পারে বিদেশি চালানও

by ABDUR RAHMAN
ভারতের রায়গড়ে উৎসবের আগেই বন্যায় ধ্বংস হলো কোটি টাকার গণেশমূর্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

গণেশ চতুর্থীর আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। ঠিক এমন সময় ভারতের মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ধ্বংস হয়ে গেছে লাখ লাখ মাটির গণেশমূর্তি। টানা ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় শুধু প্রস্তুত মূর্তিই নয়, নষ্ট হয়েছে কাঁচামাল, ছাঁচ ও কর্মশালাও। এতে কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে এবং বিপন্ন হয়ে পড়েছে হাজারো মৃৎশিল্পী পরিবারের জীবিকা।

বিজ্ঞাপন
banner

মূর্তি নির্মাতাদের সংগঠন গণেশ মূর্তিকার উৎকর্ষ মণ্ডলের সভাপতি শচীন পাটিল জানান, এবারের বন্যায় রায়গড়ে প্রায় ১০ লাখ গণেশমূর্তি এবং প্রায় তিন হাজার মৃৎশিল্প কর্মশালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করছে এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

রায়গড় ভারতের অন্যতম বৃহৎ গণেশমূর্তি উৎপাদন কেন্দ্র। জেলার প্রায় ২০ হাজার কর্মশালায় প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ মাটির গণেশমূর্তি তৈরি হয়। প্রায় ৩৫০ কোটি রুপির এই শিল্পে মৌসুমি কর্মসংস্থান হয় প্রায় দেড় লাখ মানুষের। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে ভারতের লাখো পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এসব মূর্তি স্থাপন করে পূজা শেষে জলাশয়ে বিসর্জন দেয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রায়গড়ের ভাস্কর দিলীপ মাত্রের কর্মশালায় এখন শুধু ভাঙা মাটির মূর্তির স্তূপ। প্রায় ছয় মাসের পরিশ্রমে তিনি ৫০০টি গণেশমূর্তি তৈরি করেছিলেন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় আট লাখ রুপি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলো বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে সব মূর্তি নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ধ্বংস হয়েছে ছাঁচ, মাটি, প্লাস্টার অব প্যারিসসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল।

দিলীপ বলেন, এখন গ্রাহকদের অর্ডার পূরণ করা সম্ভব নয়। অনেকের অগ্রিম টাকা ফেরত দিতে ঋণ নেওয়ার কথাও ভাবছেন তিনি। তার ভাষায়, “আগে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পানি জমলেও কর্মশালায় কখনও পানি ঢোকেনি। এবার সবকিছু ভেসে গেছে।”

একটি গণেশমূর্তি তৈরি করতে ছাঁচ তৈরি, গড়ন, শুকানো এবং রং করার মতো একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ছোট মূর্তি তৈরি করতেও প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে, আর বড় মূর্তি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। ফলে এত স্বল্প সময়ে নতুন করে উৎপাদন শুরু করা অধিকাংশ কারিগরের পক্ষেই সম্ভব নয়।

ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে রায়গড়ে ৫৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। মাত্র তিন দিনের এই বৃষ্টিপাত গত বছরের পুরো জুলাই মাসের বৃষ্টিপাতের প্রায় সমান। অতিবৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

স্থানীয় কারিগররা জানান, প্রতি বছর বর্ষাকালে প্লাস্টিকের আচ্ছাদন ও উঁচু প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা মূর্তিগুলো রক্ষা করেন। কিন্তু এবারের টানা বর্ষণ ও প্রবল বাতাসে সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ব্যর্থ হয়েছে। অনেক কর্মশালার সব কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে কাজ শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বন্যার প্রভাব স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিদেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত কিছু চালান বিলম্বিত হতে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ার মধ্যেই নতুন এই দুর্যোগ শিল্পটিকে আরও বড় সংকটে ফেলেছে।

কিছু কর্মশালার মালিকের বীমা থাকলেও তারা বলছেন, ক্ষতির তুলনায় বীমা থেকে পাওয়া অর্থ খুবই সামান্য। ফলে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত কারিগরকে নিজেদের সঞ্চয় কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত কারিগররা বেঁচে যাওয়া মূর্তিগুলো শুকিয়ে মেরামতের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থায়ী ছাউনি নির্মাণ, উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস পেলেই মূর্তিগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে আপাতত তাদের প্রধান লক্ষ্য—যতটা সম্ভব মূর্তি রক্ষা করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখা।

সূত্র: বিবিসি

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ