নিজস্ব প্রতিবেদক
কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য ঐক্য নিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রস্তাবিত ফর্মুলার ওপর বিশ্লেষণ তুলে ধরে নয়টি প্রস্তাব দিয়েছেন আলেম, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ। তিনি মনে করেন, টেকসই সাত দলের ঐক্যের জন্য স্পষ্ট নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, নির্বাচনী আসন সমন্বয়ের সূত্র এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামো প্রয়োজন।
২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঐক্যের একটি সমন্বিত খসড়া রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হলেও সব বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরে ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সাত দলের প্রত্যেকটি থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি এবং হেফাজতের আরও কয়েকজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ফর্মুলার মূল ধারণা হলো সাতটি দল নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে অভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক স্বার্থে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে কাজ করবে।
ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সাত দলের সমন্বয়ে ২১ সদস্যের একটি জোট শুরার কথা রয়েছে। প্রত্যেক দল থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এই শুরা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি শুরা থেকে সভাপতি, সেক্রেটারি, মুখপাত্র ও প্রচার সম্পাদক নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ থেকে ১৩ সদস্যের একটি উপদেষ্টা কমিটির প্রস্তাবও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। যৌথ সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচিতে ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান, অপপ্রচার ও কটূক্তি থেকে বিরত থাকা এবং যৌথ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতার কথাও ফর্মুলায় রয়েছে।
মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ মনে করেন, হেফাজতে ইসলাম একটি বৃহত্তর সামাজিক-ধর্মীয় প্ল্যাটফর্ম, আর সাতটি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দল। তাই হেফাজতের নৈতিক নেতৃত্ব ও মধ্যস্থতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রার্থী নির্বাচন, আসন বণ্টন, নির্বাচনী জোট ও রাজনৈতিক কৌশলের সিদ্ধান্ত সাত দলের রাজনৈতিক কাঠামোর হাতে থাকা উচিত।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, হেফাজত ঐক্যের নৈতিক অভিভাবক ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব থাকবে সাত দলের সমন্বিত কাঠামোর কাছে।
সাত দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও বর্তমান সম্পর্ক এক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো দলকে সব ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে বিরত রাখার বিধান বাস্তবে সংকট তৈরি করতে পারে।
এ কারণে অন্য রাজনৈতিক জোট বা দলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে স্বার্থসংঘাতের বিষয়ে পূর্বনির্ধারিত নিয়ম করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, সাত দলের অভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে। তবে সাত দলের বাইরের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যেক দলের সাংগঠনিক স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন।
প্রতিটি বিষয়ে সাত দলের সর্বসম্মতি বাধ্যতামূলক হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ।
তিনি প্রস্তাব করেছেন, আকিদা ও মৌলিক নীতির বিষয়ে সর্বসম্মতি বাধ্যতামূলক রাখা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অন্তত পাঁচ দলের সম্মতি এবং সাধারণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের বিধান রাখা যেতে পারে।
জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য বড় তিনটি দলের আমিরের ওপর সীমিত দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। পরে সেই সিদ্ধান্ত শুরার অনুমোদনের আওতায় আনার কথা বলেছেন।
প্রত্যেক দল থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে ২১ সদস্যের শুরা গঠনের প্রস্তাবকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তার মতে, সমানসংখ্যক প্রতিনিধিত্ব সব দলের রাজনৈতিক শক্তি বা সাংগঠনিক সক্ষমতার সমান হওয়ার অর্থ নয়। তাই প্রতিনিধিত্বের সমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাবিত নেতৃত্বের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন নিয়ে মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ বলেন, ছয় মাসের মেয়াদ কার্যকর সমন্বয়ের জন্য তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
তিনি নেতৃত্বের মেয়াদ এক বছর করার প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে সভাপতি ও সদস্যসচিব একই দলের না হয়ে ভিন্ন দুটি দলের হলে ভারসাম্য আরও ভালো হতে পারে বলে মত দিয়েছেন।
এ ছাড়া নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি স্থায়ী সমন্বয় সেল রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
সাত দলের ঐক্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নির্বাচনী আসন সমন্বয় হতে পারে বলে মনে করেন মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কোন দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা কতটুকু, জনসমর্থন কীভাবে পরিমাপ করা হবে এবং কোন প্রার্থীকে জনপ্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয়ে আগে থেকেই নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকা প্রয়োজন।
এ জন্য তিনি একটি লিখিত Seat Allocation Formula বা আসন বণ্টন সূত্র তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার প্রস্তাবিত বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে আগের নির্বাচনের ফল, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল, স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সংগঠনের সক্ষমতা এবং জোটের সামগ্রিক নির্বাচনী স্বার্থ।
এগুলো যাচাই করতে সাত দলের বাইরে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনী মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
সাত দলের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি মধ্যপন্থী ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ।
তার প্রস্তাব হলো, প্রত্যেক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সাত দলের অভিন্ন সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়ার আগে সাত দলের কাউন্সিলকে বিষয়টি জানাতে হবে।
জোটের নীতি বা আকিদার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, প্রথমে অভিযোগ উত্থাপন, এরপর সংশ্লিষ্ট দলের লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ এবং পরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ঐক্যে কোনো দল ভবিষ্যতে বের হয়ে যেতে চাইলে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে, সেটিও শুরুতেই লিখিতভাবে নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ।
তার মতে, এ ধরনের নিয়ম আগে থেকে স্পষ্ট থাকলে অনিশ্চয়তা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস কমতে পারে।
লিয়াজোঁ কমিটির আলোচনার জন্য তিন স্তরের একটি ঐক্য কাঠামো প্রস্তাব করেছেন তিনি।
প্রথম স্তরে নীতিগত ঐক্যের কথা বলেছেন। এর আওতায় ইসলামি মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নাগরিক অধিকার, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং পারস্পরিক সম্মানের মতো বিষয়ে লিখিত ঐকমত্যের প্রস্তাব দিয়েছেন।
দ্বিতীয় স্তরে রাজনৈতিক সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যৌথ অবস্থান, প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ কর্মসূচি এবং অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে প্রত্যেক দলের নিজস্ব সাংগঠনিক পরিচয় ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম স্বাধীন রাখার কথা বলেছেন তিনি।
তৃতীয় স্তরে নির্বাচনী সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছেন মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ। নির্বাচন সামনে এলে পৃথক নির্বাচনী সমন্বয় কমিটি গঠন করে প্রতিটি আসনের তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ধারিত সূত্র অনুযায়ী আসন বণ্টনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মতবিরোধ হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, পরে কেন্দ্রীয় সমন্বয় এবং প্রয়োজন হলে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব রয়েছে তার কাঠামোয়।
মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদের মতে, সাত দলের ঐক্যের ক্ষেত্রে প্রথমেই এই ধারণা পরিষ্কার করা প্রয়োজন যে ঐক্য মানে এক দল হয়ে যাওয়া নয়। একইভাবে সব বিষয়ে একমত হওয়াও ঐক্যের শর্ত নয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে থাকা এবং ভিন্ন বিষয়ে পরস্পরের স্বাধীনতাকে সম্মান করাই টেকসই ঐক্যের ভিত্তি হতে পারে।
তিনি হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগকে কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের বিভাজন ও পারস্পরিক দূরত্ব কমানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।
তার মতে, আবেগ দিয়ে ঐক্য শুরু করা সম্ভব হলেও টেকসই করতে প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি, এখতিয়ার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, নির্বাচনী ফর্মুলা, বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার নিয়ম।
হেফাজতে ইসলাম ও সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির প্রতি একজন ঐক্যপ্রত্যাশী হিসেবে তাঁর আহ্বান, প্রস্তাবিত ফর্মুলাকে শুধু ঐক্যের কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে এমন একটি কাঠামোতে রূপ দেওয়া হোক, যা পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকতে পারে।
মুফতি সালাহুদ্দীন মাসউদ লেখাটির শেষে টেকসই ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ঐক্য কারও অস্তিত্ব মুছে দিয়ে নয়, সমন্বয় কারও স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নয় এবং সিদ্ধান্ত কোনো একটি দলকে অসহায় করে নয়—এমন কাঠামোই প্রয়োজন।

