বিশেষ প্রতিবেদন
সেপ্টেম্বর শুরু হতেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার চিত্র সামনে এসেছে। এক দিনে ১ হাজার ৫৫৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—চলতি বছরের এ পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি। ওই ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর পরের ২৪ ঘণ্টাতেও পরিস্থিতির চাপ কমেনি; নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন এবং মারা গেছেন আরও চারজন। ফলে ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ এবং মৃত্যু ১২১ জনে।
পরপর দুই দিনে দুই হাজার ৮৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি এবং আটজনের মৃত্যুর ঘটনা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেঙ্গুর বর্তমান গতিপ্রকৃতিকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাসও বলছে, চলমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু কতজন আক্রান্ত হয়েছেন তা নয়; বরং কেন সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণের গতি বাড়ছে, এই চাপ কতটা বাড়তে পারে এবং হাসপাতালগুলো তা সামাল দেওয়ার জন্য কতটা প্রস্তুত—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রেকর্ড ১,৫৫৮ রোগী ভর্তির পরও কমেনি চাপ
৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। একই সময়ে মারা যান চারজন। এর ফলে সেদিন পর্যন্ত চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৫৯০ এবং মৃত্যু ১১৭। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৫৮ জনের দৈনিক ভর্তি ছিল ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৩২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
কিন্তু রেকর্ডের পরদিনও নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা এক হাজারের নিচে নামেনি। ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৩১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। মারা যান চারজন। এতে মোট রোগী বেড়ে ৪৩ হাজার ৯০৪ এবং মৃত্যু ১২১-এ পৌঁছায়।
অর্থাৎ ১,৫৫৮ জনের রেকর্ড দৈনিক ভর্তির পরের দিন নতুন ভর্তি কমলেও তা ছিল ১,৩১৪—যা এখনো অত্যন্ত উচ্চ দৈনিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কোথায় কত রোগী ভর্তি?
৭ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩১৪ নতুন রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে—২৩৫ জন।
এরপর রয়েছে—
| এলাকা | নতুন ভর্তি |
|---|---|
| খুলনা বিভাগ | ২৩৫ |
| ঢাকা বিভাগ | ২২৫ |
| চট্টগ্রাম বিভাগ | ১৯৮ |
| বরিশাল বিভাগ | ১৫৩ |
| ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন | ১৪৩ |
| ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন | ১৩৯ |
| রাজশাহী বিভাগ | ৯৯ |
| ময়মনসিংহ বিভাগ | ৮১ |
| রংপুর বিভাগ | ৩৬ |
| সিলেট বিভাগ | ৫ |
| মোট | ১,৩১৪ |
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর বর্তমান চাপ শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। রাজধানী ও দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
শুধু রাজধানী নয়, ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর উপস্থিতি
Reuters-এর প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাঁর মতে, ঢাকার বাইরে এবং অন্যান্য বড় শহরের বাইরে এডিস মশার বিস্তারও সংক্রমণ বাড়ার একটি কারণ। তবে রাজধানী এখনো মোট সংক্রমণের বড় অংশ বহন করছে।
এটি ডেঙ্গুর বর্তমান ভৌগোলিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে শুধু ঢাকার হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো নয়, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রবণতায় সেপ্টেম্বর বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ সময়। চলতি বছরও আগস্টের পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
Reuters-এর প্রতিবেদনে অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নজরদারি ও পূর্বাভাস মডেলের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অনুকূল থাকতে পারে।
তবে এটি পূর্বাভাস, সরকারি নিশ্চিত পরিসংখ্যান নয়। বাস্তবে সেপ্টেম্বরের মোট রোগী কত হবে, তা নির্ভর করবে সংক্রমণের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি, আবহাওয়া, এডিস মশার বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতার ওপর।
অধ্যাপক বাশারের উদ্ধৃতি দিয়ে Reuters আরও জানিয়েছে, তাঁর মূল্যায়নে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় এখনো আসেনি এবং বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর বছরের সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের মাসে পরিণত হতে পারে।
আবহাওয়া ও এডিস মশার সম্পর্ক
ডেঙ্গুর বিস্তারে এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টির পর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক হতে পারে।
এই কারণেই সেপ্টেম্বরের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নজর রয়েছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান আবহাওয়া অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণকে সহায়তা করতে পারে।
তবে আবহাওয়া একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। নগর ব্যবস্থাপনা, জমে থাকা পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার সক্ষমতাও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত।
শুধু ফগিংয়ে কি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
Reuters-কে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাঁর মতে, যেখানে এডিস মশা প্রজনন করছে, সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
এর অর্থ হলো, মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমের কার্যকারিতা শুধু কত এলাকায় ফগিং হয়েছে—এই হিসাব দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কোথায় এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি এবং কোথায় প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৯৯৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৩১৪ জন ভর্তি হওয়ায় ৭ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৭৪ জনে দাঁড়ায়।
Reuters-এর প্রতিবেদনে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে একজন অভিভাবকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলা হয়, তাঁর চার বছরের শিশুকে নিয়ে তিনটি সরকারি হাসপাতালে গিয়েও তিনি প্রথমে শয্যা পাননি; পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে সক্ষম হন। এটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, তবে একই প্রতিবেদনে হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তে থাকা চাপের বিষয়টি সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা দ্রুত তৈরি হতে পারে। Reuters-এর প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জ্বর কমে যাওয়ার পরও কিছু রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। প্লাজমা লিকেজ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক ও মারাত্মক রক্তক্ষরণের মতো জটিলতার ঝুঁকিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে।
হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ
রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, সিভিল সার্জনদের হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার করতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মশারি নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ওয়ার্ডে মশারির ব্যবস্থা করা এবং স্যালাইন, ওষুধ ও ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিটের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কোনো এলাকায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে কেন্দ্রীয় সরবরাহের অপেক্ষা না করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব বাজেট ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ হাসপাতাল প্রস্তুতির বিষয়টি এখন কেবল শয্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রোগী ভর্তি, পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী এবং মশার কামড় থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের সুরক্ষা—সবগুলোই ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে উঠেছে।
দুই দিনের পরিসংখ্যানে কী দেখা যাচ্ছে?
ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক গতি বোঝার জন্য পরপর দুই দিনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
| সূচক | ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত | ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত |
|---|---|---|
| সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি | ১,৫৫৮ | ১,৩১৪ |
| সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু | ৪ | ৪ |
| মোট হাসপাতালে ভর্তি | ৪২,৫৯০ | ৪৩,৯০৪ |
| মোট মৃত্যু | ১১৭ | ১২১ |
| চিকিৎসাধীন | ২,৯৯৫ | ৩,০৭৪ |
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—রেকর্ড ১,৫৫৮ জন ভর্তির পরের দিনও নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা ১,৩১৪। ফলে এক দিনের রেকর্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার বদলে পরপর দিনের প্রবণতাকে বিবেচনা করা জরুরি।
আগের বছরের তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?
চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৯০৪ জন এবং মারা গেছেন ১২১ জন। পূর্ণ বছরের হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।
২০২৩ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
| বছর | হাসপাতালে ভর্তি | মৃত্যু |
|---|---|---|
| ২০২৩ | ৩,২১,১৭৯ | ১,৭০৫ |
| ২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
| ২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
| ২০২৬* | ৪৩,৯০৪ | ১২১ |
* ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ৮টা পর্যন্ত।
তবে এই তুলনা করার সময় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—২০২৬ সালের সংখ্যা পূর্ণ বছরের নয়। ফলে আগের পূর্ণ বছরের সঙ্গে সরাসরি মোট সংখ্যার তুলনা করে বছরের শেষের পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বরং বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক দৈনিক ভর্তির গতি বেশি প্রাসঙ্গিক।
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের বার্তা কী?
৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১২১ মৃত্যুর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনেই ২৪ জন মারা গেছেন। একই সময়ে হাজারের বেশি রোগী প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে মাসের শুরুতেই সংক্রমণের চাপ যে বাড়ছে, তা সরকারি দৈনিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। (BSS)
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন কেবল একটি শহর বা একটি অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। খুলনা সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ নতুন রোগী দিয়েছে; একই সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকেও রোগী ভর্তি হয়েছেন। (BSS)
অর্থাৎ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি
বর্তমান তথ্য বিশ্লেষণ করলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় তিনটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রথমত, সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ।
এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস না করলে নতুন রোগীর প্রবাহ কমানো কঠিন হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের সক্ষমতা।
দৈনিক এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, স্যালাইন, ওষুধ, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
তৃতীয়ত, রোগী শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ।
ডেঙ্গুতে শুধু জ্বর কমেছে কি না, সেটিই রোগীর সুস্থতার একমাত্র সূচক নয়। গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকায় রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে চিকিৎসকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এখন নজর সেপ্টেম্বরের পরবর্তী সপ্তাহে
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে। ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক দিনে রেকর্ড ১ হাজার ৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ১ হাজার ৩১৪ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে দুই দিনেই চারজন করে মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি পূর্বাভাস হলো, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বরের সংক্রমণ আগস্টের তুলনায় আরও তীব্র হতে পারে। তবে এই পূর্বাভাস এখনো ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনুমান; নিশ্চিত ফলাফল নয়।
নিশ্চিত তথ্য হলো—৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে চলতি বছরে ৪৩ হাজার ৯০৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১২১ জন মারা গেছেন। ৩ হাজার ৭৪ জন তখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সেপ্টেম্বরের পরবর্তী দিনগুলোতে দৈনিক নতুন রোগী, মৃত্যু, চিকিৎসাধীন রোগী এবং অঞ্চলভিত্তিক সংক্রমণের গতি—এই চারটি সূচকই বলে দেবে বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কতটা স্থায়ী হচ্ছে। এর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও ডেঙ্গু মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সূত্র: Reuters, BSS, Internazionale
ফাতীহ মুহাম্মাদ সোলাইমান

