বাংলাদেশের গ্যাস সংকট : শিল্পকারখানায় উৎপাদন থমকে, বাড়ছে অর্থনীতির চাপ

গ্যাসের চাপ কমে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, কিছু কারখানা বন্ধ; LNG সরবরাহ বাড়লেও কাঠামোগত ঘাটতি কাটেনি

by Master Fatih
গ্যাস সংকটে বাংলাদেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের গ্যাস সংকট এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদনে। সাম্প্রতিক সময়ে LNG সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ উন্নত হয়েছে, কিন্তু শিল্পাঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানিতে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২২ আগস্ট সকাল ৮টা থেকে ২৩ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত LNG-সহ দেশের মোট গ্যাস উৎপাদন ছিল ২,৩১৫ মিলিয়ন ঘনফুট।

বিজ্ঞাপন
banner

কিন্তু মোট সরবরাহের হিসাবই শিল্পের বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। শিল্পকারখানার উৎপাদন নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ ও ধারাবাহিক সরবরাহের ওপর। বর্তমান সংকটের বড় সমস্যা সেখানেই।

নারায়ণগঞ্জে উৎপাদনে সরাসরি আঘাত

শিল্পঘন এলাকা নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার প্রভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অন্তত ৮৫টি ডাইং এবং ৬৫টি গার্মেন্ট কারখানা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কারখানায় গ্যাস নেই, আর কিছু কারখানায় চাপ মাত্র ২ থেকে ৪ পিএসআই—যা স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় কম।

গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ কমে না। ডাইং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট শিল্পে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি।

বিকল্প জ্বালানি মানেই বাড়তি খরচ

গ্যাস না থাকলে শিল্পকারখানার সামনে সাধারণত উৎপাদন কমানো বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের পথ থাকে। কিন্তু বিকল্প জ্বালানি অনেক ক্ষেত্রেই বেশি ব্যয়বহুল।

ইস্পাত শিল্পে এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় স্টিল উৎপাদকদের ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং অনেক কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

অর্থাৎ গ্যাসের সংকট শিল্পের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে—একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে উৎপাদনের ইউনিট খরচ বাড়ছে।

একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের অর্থ

২৪ আগস্ট ফু-ওয়াং ফুডের পরিচালনা পর্ষদ গ্যাসের অপর্যাপ্ত চাপ ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ছয় মাসের জন্য একটি কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কোম্পানিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এতে ৯৯২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এটি বিচ্ছিন্ন একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নাকি বৃহত্তর শিল্প সংকটের প্রতিফলন—সে বিষয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন। তবে ঘটনাটি দেখায়, দীর্ঘ সময় জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সংকট শুধু উৎপাদন কমানোর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ধারাবাহিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সংকটের পেছনে শুধু দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি নয়

বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক LNG সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইরান সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় LNG সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

জুলাইয়ে রয়টার্স জানিয়েছিল, কাতারএনার্জি ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের নির্ধারিত LNG সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ কাতারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭ মিলিয়ন টন LNG আমদানি করেছিল, যার মধ্যে প্রায় ৪.১৫ মিলিয়ন টন এসেছিল কাতার থেকে।

এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত LNG কেনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট ও উচ্চমূল্যের সময়ে স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভরতা দেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।

LNG টার্মিনাল চালু হলেও সমস্যা কেন কাটছে না

বাংলাদেশের LNG অবকাঠামোতেও সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যা হয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি ভাসমান LNG টার্মিনাল ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আগস্টের শুরুতে টার্মিনালটির একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে শুরু করে।

তবে LNG টার্মিনাল পুনরায় চালু হওয়া মানেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান নয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০–৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল।

অর্থাৎ অবকাঠামোগত বাধা দূর হলেও চাহিদা ও সরবরাহের কাঠামোগত ব্যবধান রয়ে যাচ্ছে।

শিল্পের ওপর প্রভাব কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে

গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব কয়েকটি স্তরে পড়তে পারে।

প্রথমত, উৎপাদন কমলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয় কমবে এবং স্থায়ী ব্যয় একই থাকায় প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

তৃতীয়ত, রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ থেকে অর্ডার ধরে রাখছেন বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চতুর্থত, সংকট যদি উৎপাদন বন্ধের পর্যায়ে যায়, তাহলে শ্রমিক ছাঁটাই বা কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফু-ওয়াং ফুডের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই ঝুঁকির একটি উদাহরণ।

শিল্প মালিকদের দাবি কী

গ্যাস সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা BKMEA শিল্পে সরবরাহ বাড়াতে যানবাহনে গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি সংকট পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত সরকারি ব্রিফিংয়েরও দাবি করেছে।

এতে বোঝা যায়, শিল্পমালিকদের কাছে সমস্যাটি শুধু গ্যাসের পরিমাণের নয়; সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নীতিগত ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংকটের সাময়িক স্বস্তি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

সাম্প্রতিক LNG কার্গো আসায় জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা উন্নত হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের কাঠামোগত ঘাটতি, দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, LNG আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সংকটের মূল কারণগুলো এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: শিল্পের উৎপাদন কি প্রতিবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করবে, নাকি নির্ভরযোগ্য দেশীয় উৎপাদন, LNG সরবরাহের বৈচিত্র্য এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা হবে?

বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, গ্যাস সংকটকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব ধরা পড়বে না। উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বিনিয়োগ—সবকিছুর সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা সরাসরি যুক্ত। তাই সাময়িকভাবে LNG সরবরাহ বাড়লেও বাংলাদেশের শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি এখনো অনিষ্পন্ন।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ