অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ঢাকার শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ট্যাব ও কম্পিউটারে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে শিশুদের ঘুম কমে যাওয়া, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং মানসিক জটিলতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বি।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীর ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী অধিকাংশ শিশু প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহার করছে। গবেষণাটি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। অংশ নেওয়া স্কুলগুলোর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম—উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল।
গবেষকদের তথ্যমতে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় চারজন দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে ব্যয় করছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দৈনিক দুই ঘণ্টার মধ্যে রাখা উচিত।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের ঘুমের সময় কমে যাচ্ছে। যারা দীর্ঘ সময় মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ঘুমায়। অথচ সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এই বয়সী শিশুদের প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
শুধু ঘুমের ঘাটতিই নয়, শিশুদের মধ্যে শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘ সময় বসে থেকে স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুইজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা অথবা আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মত গবেষকদের।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বির অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, শিশুদের মধ্যে দেরিতে ঘুমানো, খিটখিটে আচরণ, চোখে অস্বস্তি, ঘন ঘন মাথাব্যথা কিংবা বাইরের খেলাধুলায় অনীহা দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে ডিভাইস ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তিনি অভিভাবকদের সন্তানদের খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিতর্কচর্চা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, দলীয় পড়াশোনা ও গাছের যত্ন নেওয়ার মতো সৃজনশীল কাজে শিশুদের যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
শিশুদের চোখের সুরক্ষায় গবেষকরা ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং পরিবার, স্কুল ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও কার্যকর নির্দেশিকা প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
আর/

