মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম >>
১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয়। মাত্র প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাষ্ট্র, কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্তে তারা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির সিনেট সম্প্রতি ‘ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রবর্তন আইন’ অনুমোদন করেছে।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সংশোধনী নয়; বরং স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি প্রচলিত ব্যাংকগুলো ‘ইসলামিক উইনডো’ পরিচালনা করতে পারবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা করব্যবস্থায়ও নীতিগত সামঞ্জস্য এনেছে। ট্যাক্স কোডে ইসলামী অর্থায়নের জন্য আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। ফলে মুরাবাহার মতো পণ্যভিত্তিক বিক্রয় চুক্তিতে অর্জিত লাভকে ভ্যাটমুক্ত রাখা হয়েছে, যাতে তা সুদভিত্তিক আয়ের সঙ্গে কর-সমতায় থাকে।
সাধারণত সুদী ব্যাংকের সুদভিত্তিক আয় ভ্যাটের আওতায় পড়ে না। আমাদের দেশেও ইসলামী ব্যাংকের আয়কে কার্যত সেইভাবে ট্রিট করে ভ্যাটমুক্ত রাখা হয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো, উজবেকিস্তান ইসলামী অর্থায়নকে আলাদা পণ্যভিত্তিক লেনদেন হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে ভ্যাটমুক্ত করেছে। অর্থাৎ তারা ইসলামী ফাইন্যান্সকে নিজস্ব কাঠামো হিসেবে ‘own’ করেছে; ধার করা ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করেনি।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক- এর নির্দেশনা ও ব্যাংক কোম্পানি এ্যক্টt- এর কাঠামোর মধ্যে। কিন্তু এখনও পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইন ও আলাদা কর-অধ্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে নীতিগত ‘ownership’ প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে গেছে।
নীতিনির্ধারণের স্তরে ইসলামী অর্থায়নকে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা- একটি বড় রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক সাহসের বিষয়। গত অর্ধশতাব্দীতে বিভিন্ন সময় ইসলামী রাজনীতি প্রভাবশালী হলেও নীতিগত মালিকানার এই ধারণা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে তার পরিচয় অর্থনৈতিক কাঠামোতেও প্রতিফলিত করতে চায়, তবে কেবল ‘ব্লু ইকোনমি’ বা অবকাঠামোগত প্রবৃদ্ধির আলোচনা যথেষ্ট নয়। সম্ভাবনাময় ইসলামী ফাইন্যান্স খাতকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্বতন্ত্রভাবে স্থান দেওয়া জরুরি।
উজবেকিস্তানের এই পদক্ষেপ আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে। বিশেষত আইন প্রণয়ন, কর-সমতা এবং শরীআহসম্মত আর্থিক কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে আমরা কি সেই নীতিগত স্বীকৃতি দেওয়ার মতো প্রস্তুত?
লেখক: সহকারী মুফতি, জামিয়া শারইয়াহ মালিবাগ, ঢাকা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আইএফএ কনসালটেন্সি লিমিটেড।
আবুআ/

