আলি হাসান উসামার জামায়াতে যোগদানকে যেভাবে দেখছেন কওমি আলেমরা

by fateema janna

খেলাফত মজলিস ছেড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছেন দেশের আলোচিত বক্তা ও তরুণ আলেম মুফতি আলী হাসান উসামা। তার এই অবস্থানের কারণে কওমি অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেয়া দিয়েছে।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) তার জামায়াতে যোগদানের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম মন্তব্য করছেন অনেকে। তাদের একজন সাধারণ আলেম সমাজের আহ্বান ও যাত্রবাড়ী মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা রিদওয়ান হাসান।

বিজ্ঞাপন
banner

তিনি তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘জামায়াতের দলীয় নামে ইসলাম শব্দটি থাকলেও দলের আমীর আলেম নন। আল্লামা সাঈদীর পরে জামায়াতে আলী হাসান উসামার মতো হেভিওয়েট কোনো আলেম নাই। এজন্য আলী হাসান উসামার জামায়াতে যোগদানকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখছি৷ তিনি যদি তার ইলম ও তাকওয়ার স্বাধীনতা, নফসের নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মমর্যাদাশীল সায়ত্তশাসন—এই তিনটি মূলনীতি বজায় রেখে চলেন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিরাপদ থাকতে পারবেন।’

রিদওয়ান হাসান আরো লেখেন, ‘তিনি জামায়াতের রাজনীতিতে গেছেন, এতে আমি সমালোচনা করছি না। রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাকে তিনটি মূলনীতি মাথায় রাখতে হবে৷ সত্য বলার সৎসাহস থাকতে হবে, জনগণের কল্যাণকামিতা থাকতে হবে এবং সর্বশেষ দলের ওপর নৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনটি মূলনীতি তাকে ম্যোরাল ডিসটেন্স রাখতে সাহায্য করবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনটি মূলনীতি তাকে সত্যিকারের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ করে তুলবে। এই ছয়টি মূলনীতি শাসকের সঙ্গে আলেমদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য৷ আলী হাসান উসামার জন্য শুভকামনা।

মাওলানা রিদওয়ান হাসান বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এটি নিয়ে ‘রহস্যজনক’ মন্তব্য করেছেন নিয়া বড় মসজিদের খতিব ও আলোচিত আলেম মাওলানা নুমান কাসেমী। তিনি লিখেছেন, “শোনা যাচ্ছে- আলী হাসান উসামা জামায়াতে ইসলামী দলে যোগ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে – মাওলানা মামুনুল হক জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক জোটে যুক্ত হয়েছেন। এগুলো যার যার নজরিয়া। আলী হাসান উসামা ‘দলে’ যোগ দিলেন। আর মাওলানা মামুনুল হক দলের ‘জোটে’ যোগ দিলেন। দুটোই আমার সমঝ বহির্ভূত।”

আলেম সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা মাওলানা রোকন রাইয়ান মুফতি আলী হাসান উসামাকে ‘নতুন এরশাদ’ আখ্যা দিয়ে তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘রাজনীতির নতুন এরশাদ আলী হাসান উসামা। এক সময় গণতন্ত্রকে হারাম বলে আলেম উলামাদের গালি-গালাজ করেছেন। হাজারো মানুষের কলিজায় ছুরি চালিয়েছেন। যে কারণে সর্বদা ঝগড়া আর তর্ক-বিতর্ক লেগেই থাকতো। সেখান থেকে কোনরকম রুজু ছাড়াই নির্বাচন সামনে রেখে খেলাফত মজলিসে যোগ দিলেন। এখন সেখানে মনোনয়ন না পাওয়ায় মুহূর্তেই পল্টি মেরে জামায়াতে যোগ দিলেন। বাহ… ভাই বাহ। কত পল্টিবাজি জানো।’

তরুণ মেধাবী আলেম মাওলানা আলকমা বিন জাফর এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘প্রবীণ-মুরুব্বীদের অনুসরণ করুন অবশ্যই নবীন জজবাওয়ালা আলেমদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকুন। ব্যক্তির পছন্দ অনুযায়ী যে কেউ যেকোনো দলে যোগদান করতে পারেন এটা তার একান্তই নিজস্ব রুচি-পছন্দ। তবে অনুকরণ অনুসরণের ক্ষেত্রে সব সময়ই প্রবীণ আলেমদেরকে বেছে নেওয়া উচিত। কারণ– নবীন আলেমগণের সিদ্ধান্ত স্থির থাকে না; সময় ও বয়সের ব্যবধানে রুচি পছন্দ এবং সিদ্ধান্ত সর্বদা পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে একেক সময় একেকটাকেই মনে করে এটাই চূড়ান্ত! তার জন্য এটা চিন্তার প্রশস্তা মনে হলেও ভক্তদের জন্য এটা অত্যন্ত বিরক্তির এবং এটা এক ধরনের পরীক্ষাও বটে। আলী হাসান হুসামা ভাইয়ের জন্য শুভকামনা। রাজনীতি করলে অবশ্যই যেখানে মূল্যায়ন সুযোগ-সুবিধা থাকবে সেই জায়গাটা বেছে নেওয়া উচিত।’

মাহমুদুল হক জালিস নামে একজন আলেম এক্টিভিস্ট লিখেছেন, ‘কওমি ঘরানার আলেমরা একসময় চরমোনাইয়ের অনেক বিষয়কে ইসলামসম্মত নয় বলতেন। তারপর ধীরে ধীরে তরুণ অনেক আলেমরা চরমোনাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন। আস্তে আস্তে সেগুলো আলোচনার দূর হয়ে গেলো। এভাবে জামায়াতেও কওমির আলেমরা যুক্ত হতে থাকলে একসময় হয়তো তাদের অনেক সমালোচনা মুছে যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাই আমার কাছে মনে হয় রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় রেখে মাপা উচিত। এখানে অন্য আলাপ এনে শুধু শুধু সাধারণ মুসলমানদেরকে দ্বিধার মধ্যে ফেলা ঠিক নয়। আর হ্যাঁ! রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মীয় বিষয়গুলোর সমালোচনা অরাজনৈতিক ব্যক্তিগণ করলে আমার কাছে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ মনে হয়। কারণ যাদের একটি আদর্শের প্রতি টান আছে তারা কখনোই সঠিক ইসলাম পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না বা করার চেষ্টা করে না।’

রাজধানীর প্রসিদ্ধ কওমি মাদরাসা দারুর রাশাদের শিক্ষক মুফতি আবু সাঈদ লিখেছেন, ‘আলি হাসান উসামা জামায়াতে যোগদান করবে তো নির্বাচনের পরেই করতো। এই সময়ে করায় যেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে; তাতে তো জোটের ভোটের বারোটা বেজে যাচ্ছে। আমার মনে হয় আলী হাসান উসামা ইচ্ছে করেই এই সময়টা বেছে নিয়েছে, যাতে জামায়াত ভোটের মাঠে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতএব, এটাকে জামায়াত বিরোধিতারই অংশ ধরতে পারেন। আলী হাসান উসামা এখনও তার মিশনের ভেতরই আছেন।’

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ