আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ মালাক্কা প্রণালি। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই রুট নিয়ে এখন বাড়ছে উদ্বেগ, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মালাক্কা প্রণালি ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর সমুদ্রপথগুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশ সিঙ্গাপুরের কাছে, যার প্রস্থ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২৯ শতাংশ। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পণ্য যেমন ইলেকট্রনিকস, শিল্পপণ্য, খাদ্যশস্য ও গাড়িও এই রুট দিয়ে চলাচল করে। বিশ্বে মোট গাড়ি বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশও এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহার করে সামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের অনুমতি চাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে মালাক্কা প্রণালির নিরাপত্তা কাঠামো মূলত জলদস্যুতা ও চোরাচালান মোকাবিলার জন্য তৈরি। তবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়লে এই ব্যবস্থাটি যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি জলদস্যুতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে ১০৮টি জলদস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে এই অঞ্চলটি সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতেও রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের বিঘ্নের সম্ভাবনা কম থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। যদি এই অঞ্চলে শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ে, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি, বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিতে পারে।
চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তেল আমদানি এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বড় অংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। একইভাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের জ্বালানির বড় অংশ এই প্রণালির মাধ্যমে আমদানি করে থাকে।
বিকল্প পথ হিসেবে সুন্দা ও লম্বক প্রণালির কথা বলা হলেও সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর এবং বড় জাহাজ চলাচলের জন্য সীমাবদ্ধ। ফলে নিকট ভবিষ্যতে মালাক্কা প্রণালির বিকল্প তৈরি হওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছে—যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আর/

