অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দীর্ঘদিন কমিশন শূন্য থাকার কারণে আলোচিত দুর্নীতি ও ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির মামলাগুলোতে কার্যকর আইনি প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সুযোগে একের পর এক আলোচিত আসামি জামিনে মুক্ত হচ্ছেন, অথচ দুদক কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স টু করাপশন’ নীতির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে বলেও মত দিয়েছেন আইন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের বড় অনিয়ম, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাগুলোতে দুদকের দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকায় প্রশ্ন উঠছে সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে।
দুদকের দায়ের করা একটি আলোচিত মামলায় সাবেক জনতা ব্যাংক চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়, বিতর্কিত ব্যবসায়ী ইউনূছ বাদলের মালিকানাধীন অ্যাননটেক্স গ্রুপকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ সুবিধা দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিপুল অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল। মামলাটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়ের করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ইউনূছ বাদল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নিয়েছিলেন। এসব অনিয়ম দীর্ঘ সময় তদন্তের বাইরে ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে মামলায় গ্রেপ্তার হন ড. আবুল বারকাত। তবে আপিল বিভাগ তার জামিন বহাল রাখায় কারামুক্তিতে এখন আর আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।
অন্যদিকে অর্থ পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাদেক অ্যাগ্রোর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেনও হাইকোর্ট থেকে স্থায়ী জামিন পেয়েছেন। দুদকের মামলায় তার বিরুদ্ধে ১৩৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। একইভাবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকও দুর্নীতির মামলায় জামিন পেয়েছেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীরও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় জামিন পেয়েছেন। আদালত শুধু জামিনই নয়, বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিও দিয়েছেন। এসব ঘটনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—দুর্নীতির মামলাগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষ আদৌ কতটা সক্রিয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দুদক আইন অনুযায়ী কমিশনের অধীনে আলাদা প্রসিকিউশন ইউনিট থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তারাই আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নিশ্চিত করছেন। তবে দুদকের পক্ষে সরাসরি ও শক্ত অবস্থান না থাকায় অনেক মামলাতেই কার্যকর বিরোধিতা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ মো. মইদুল ইসলাম বলেছেন, কমিশন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তও বর্তমানে ঝুলে আছে। এতে দুর্নীতির মামলার আসামিরা সুবিধা পাচ্ছেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, আর্থিক খাতে অনিয়ম ও উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগগুলো নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট এবং অর্থ পাচার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফলে আলোচিত এসব মামলার অগ্রগতি এখন জনমতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আর/

