অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
পুলিশ প্রশাসনে সাম্প্রতিক কয়েকটি পদায়নকে কেন্দ্র করে বাহিনীর ভেতরে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও হত্যা মামলার অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসি ও জেলা পর্যায়ে এসপি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ভাবমূর্তি নিয়ে।
বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যেসব কর্মকর্তাকে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হয়েছিল, তাদের অনেককেই আবার রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমেই এসব পদায়ন হচ্ছে।
সম্প্রতি ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তার নামে দুটি হত্যা মামলাও রয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবদল নেতা মিজান হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় মাহবুব আলম খানকে আসামি করা হয়। এছাড়া আরও একটি হত্যা মামলায় তার নাম রয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
একইভাবে আলোচনায় রয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। ২০২৩ সালে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানায় দায়িত্ব পালনকালে বদলির সময় থানার এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও আসবাবপত্র নিজ বাসায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে তাকে প্রত্যাহার করা হলেও বর্তমানে তিনি রাজধানীর বনানী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফরিদুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সে সময় ঘটনাটি অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করা হয়েছিল। তিনি নিজেকেও বঞ্চিত কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন।
রাজধানীর মতিঝিল থানার বর্তমান ওসি কামরুজ্জামানও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার সাবেক ওসি মাহাবুব রহমানকে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় পদায়ন করা হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী আমলে মাদারীপুরের শিবচর থানায় দায়িত্ব পালন করা আমির হোসেন সেরনিয়াবাতকে একই থানার ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সমালোচনার মুখে চার দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নুরে আলম হত্যা মামলার আসামি পুলিশ কর্মকর্তা আরমান হোসেনকে কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসেবে পদায়নের বিষয়টিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামেও আওয়ামী আমলে আলোচিত কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। নূর হোসেন মামুন বর্তমানে চান্দগাঁও থানার ওসি এবং আতিকুর রহমান ইপিজেড থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় তাদের নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে গুলশান থানার ওসি দাউদ খান দীর্ঘদিন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে পাঠানো হলেও তিনি রাজধানীতেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ থানায় দায়িত্ব পেয়েছেন।
এসব পদায়ন নিয়ে পুলিশের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি বা ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেক কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পরও তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে পুলিশ বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। বর্তমানে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে সেই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে পরে মন্তব্য করবেন।
আর/

