আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও বন্যার স্রোতে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা পর্যন্ত ১ হাজার ১০টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু মরদেহ দেশটির সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পাওয়া গেছে। এখনো হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদীর ভয়াবহ বন্যার পর বিভিন্ন এলাকায় এখনো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। রাসুওয়া থেকে নওয়ালপরাসি পশ্চিম পর্যন্ত আটটি জেলায় মরদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলায়।
পুলিশের হিসাবে চিতওয়ানে ৩২০টি, নওয়ালপরাসি পূর্বে ২১৬টি এবং নওয়ালপরাসি পশ্চিমে ১৬৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া নুয়াকোটে ১০৩টি, গোরখায় ৬৫টি, ধাদিংয়ে ৫৬টি, রাসুওয়ায় ৩৮টি এবং তানাহুনে ৩৮টি মরদেহ পাওয়া গেছে। নারায়ণী নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া অন্তত পাঁচটি মরদেহ ভারতের ভূখণ্ডেও উদ্ধার হয়েছে।
বন্যার পর এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৯৯ জন। উদ্ধার, তল্লাশি, ত্রাণ বিতরণ এবং মরদেহ শনাক্তের কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। রাস্তা, সেতু ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে অনেক এলাকায় সরাসরি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কয়েকটি স্থাপনাতেও শ্রমিক আটকা পড়েছেন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় ৬৩৯ জন আটকা থাকার খবর রয়েছে। তাদের উদ্ধারে নেপাল, ভারত ও চীনের সমন্বয়ে ৯ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন।
নদীর প্রবল স্রোতে মরদেহ ও ধ্বংসাবশেষ বহু দূর পর্যন্ত ভেসে যাওয়ায় মূল দুর্যোগস্থল থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের এলাকাতেও মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে চিতওয়ান ও নওয়ালপরাসি অঞ্চলে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) একই দিনের হিসাবে নেপালে মৃতের সংখ্যা ১,০০৩ জন এবং নিখোঁজ ৩,৯১৬ জন। চীনের তিব্বত অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর তথ্য যোগ হলে দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ১,০১৯ জনে দাঁড়ায়। সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহের সময় ও পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যায় কিছুটা তারতম্য দেখা যাচ্ছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নেপালে আন্তর্জাতিক সহায়তাও পৌঁছাতে শুরু করেছে। উদ্ধার কার্যক্রমে ড্রোন, পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও একটি উদ্ধারকারী দল নেপালে পৌঁছেছে। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ পুনঃস্থাপন, সড়ক পরিষ্কার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণ দেওয়ার কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। সাম্প্রতিক দুর্যোগটি নেপালের অবকাঠামো, বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ঝুঁকিও নতুন করে সামনে এনেছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও বরফ-পাথর-মাটির প্রবল স্রোতের পর এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে তা ভোটেকোশি ও ত্রিশুলি নদী অববাহিকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করে।
বন্যায় সড়ক, সেতু, বসতবাড়ি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নেপালের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ও দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স ও আল জাজিরা

