অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ড. রফিকুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ডিএমকে লেকচার গ্যালারিতে ‘ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রমাণভিত্তিক পথ: নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও ইনভেন্টরি স্টাডির ফলাফল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের সংকট কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা শুধু সরকারের একক প্রচেষ্টায় সমাধান করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, শিল্পখাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতে সরকারের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সীমাবদ্ধতাগুলোকে আর ধরে রাখার সুযোগ নেই। বিপুল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে জ্বালানির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারও ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে দেশের মোট আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। অথচ ২০১৫ সালে দেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ছিল ১০ শতাংশের নিচে। বর্তমানে সেই নির্ভরতা বেড়ে প্রায় ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের কৃষি খাতের অগ্রগতিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন বিইপিআরসির এই সদস্য। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সময় প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। পরবর্তী সময়ে গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কৃষিবিদদের কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশ খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তার মতে, জ্বালানি খাতেও একই ধরনের গবেষণানির্ভর ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি বড় মানবসম্পদ রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোরও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষ করে নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যের অভাব জ্বালানি খাতের নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই তথ্যঘাটতি দূর করতে আন্তর্জাতিক মানের একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ডেটা সেন্টার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ড. রফিকুল ইসলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাতসংশ্লিষ্ট প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানসম্মত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা হবে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়ার পাশাপাশি নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে গবেষণা ও স্টাডির ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ অনেক সময় যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা গাইডলাইনের অভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ ফেরত যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এ অবস্থায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় গবেষকদের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, দেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় স্থানীয় গবেষকরা তুলনামূলক কম ব্যয়ে কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক গবেষণা করতে পারেন।
গবেষণা ও স্টাডি পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। গবেষণার ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করা গেলে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমন্বয়হীনতা এবং বাস্তবায়নের বিভিন্ন জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
একাডেমিক গবেষণার পরিধি শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা কিংবা ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান বিইপিআরসির এই সদস্য। তিনি বলেন, দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে গবেষণাকে কাজে লাগাতে হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সমাধানের কাজে যুক্ত করা গেলে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ জন্য গবেষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা, বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে একটি কার্যকর গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন ড. রফিকুল ইসলাম।
বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, সরকারের প্রয়োজন, শিল্পখাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং একাডেমিয়ার গবেষণা সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা গেলে দেশের জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশীয় সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই ও কার্যকর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম। ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ইনভেন্টরি অব বাংলাদেশ’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন আইইউবির লেকচারার মোহাম্মদ রেজওয়ান উদ্দিন। ‘রিনিউয়েবল এনার্জি এক্সপেনশন স্টাডি’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন প্রফেসর খসরু মোহাম্মদ সেলিম।
অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, জলবায়ু ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আর/

