‘গণভোট যদি অবৈধ হয়, ধানের শীষের বিজয়ও অবৈধ’— খুলনার নাগরিক সমাবেশে মাওলানা মামুনুল হক

একই নির্বাচন কমিশন ও একই দিনে সংসদ নির্বাচন-গণভোট হলে একটির ফল বৈধ, অন্যটি অবৈধ হতে পারে না: খেলাফত মজলিসের আমীর

by ABDUR RAHMAN
গণভোট যদি অবৈধ হয়, ধানের শীষের বিজয়ও অবৈধ

নিজস্ব প্রতিবেদক | হুদহুদ নিউজ

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক বলেছেন, “একই দিনে, একই নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে, একই তফসিলের অধীনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বৈধ হলে গণভোটের ফলাফল কীভাবে অবৈধ হয়? গণভোট যদি অবৈধ হয়, তাহলে ধানের শীষের বিজয়ও অবৈধ।”

বিজ্ঞাপন
banner

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) খুলনার নিউমার্কেটস্থ বাইতুল নূর মসজিদ চত্বরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস খুলনা জেলা ও মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

খুলনা জেলা সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা শরীফ সাইদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি নেয়ামতুল্লাহ কাসেমী, অফিস সম্পাদক মাওলানা রুহুল ইসলাম খাঁন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মুফতি ওয়ালিউল্লাহ ও মাওলানা শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সহ-প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাওলানা মোল্লা খালিদ সাইফুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিষদ সদস্য মুহাম্মাদ দিদারুল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুশতাক আহমাদ।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সারাদেশে নাগরিক সমাবেশের কর্মসূচি পালন করছে। এর কারণ সরকারকে অস্থিতিশীল করা নয়; বরং জনগণের অধিকার, গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জনগণের কাছে তুলে ধরা।

তিনি বলেন, “আমরা বলছি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, সরকার অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। তাহলে আমাদের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণকে বুঝতে হবে।”

তিনি বলেন, একই দিনে জনগণের হাতে দুটি ব্যালট ছিল। একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর প্রতীক ছিল। অন্যটি ছিল গণভোটের ব্যালট, যেখানে ছিল ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’। অর্থাৎ একই নির্বাচন কমিশন, একই তফসিল ও একই দিনে দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা আসন সংখ্যার ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। আর গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—৫০ শতাংশের কিছু বেশি ভোটের ফলাফল যদি বৈধ হয়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের রায় কেন অবৈধ হবে?”

তিনি আরও বলেন, “একই মায়ের গর্ভে একই দিনে দুই সন্তান জন্ম নিয়েছে। এক সন্তান—সংসদ—বৈধ, আরেক সন্তান—সংবিধান সংস্কার পরিষদ—অবৈধ, এটা কীভাবে হয়? যদি গণভোট অবৈধ হয়, তাহলে ধানের শীষের বিজয়ও অবৈধ। আর সংবিধান সংস্কার পরিষদ অবৈধ হলে বিএনপি সরকারও বৈধ থাকতে পারে না।”

তিনি বলেন, বিএনপি সংবিধান সংশোধন করতে চায়, আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চায় সংবিধানের সংস্কার। সংশোধন ও সংস্কার এক বিষয় নয়। সংসদে সংবিধান সংশোধন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া; কিন্তু জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত কোনো সাময়িক সংশোধনীর জন্য নয়, বরং স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য।

তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষ ফ্যাসিবাদকে চিরতরে বিদায় করতে চেয়েছে। ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করতে হলে স্থায়ী সংস্কার করতে হবে। দুর্বল সংশোধনীর মাধ্যমে এমন পরিবর্তন সম্ভব নয়।”

মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ঐকমত্য কমিশনে ৩৩টি রাজনৈতিক দল নয় মাসে ৮৩টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রণয়নের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপিও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে জনগণের ম্যান্ডেট অস্বীকারকারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। পরবর্তীতে দীর্ঘ ১৫ বছর জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী ফ্যাসিবাদী শাসনেরও অবসান ঘটিয়েছে। জনগণের ভোটের সঙ্গে যারা প্রতারণা করেছে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি।”

তিনি বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, “সংবিধান সংস্কার করুন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমকে স্থায়ীভাবে সংবিধানে স্থান দিন। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে সংবিধানে প্রতিষ্ঠা করুন। তা না হলে ইতিহাস আপনাদের ক্ষমা করবে না।”

জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকারের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত ও বিরোধ রয়েছে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এবং দিল্লির আধিপত্যবাদের মোকাবিলায় আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে প্রস্তুত।”

তিনি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অতীতের নেতৃত্বের আদর্শের প্রতি অটল থেকে জুলাইয়ের রাজপথের ঐক্যকে দুর্বল না করতে হবে। সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্কের সুরাহা না হলে তা সরকারের জন্যই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, “ক্ষমতার মসনদ কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে যে অঙ্গীকার করেছিলেন, আমরা আশা করি তিনি সেই অঙ্গীকার রক্ষা করবেন। জনগণের ম্যান্ডেট ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।”

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ