নিজস্ব প্রতিবেদক | হুদহুদ নিউজ
তীব্র গরমের মধ্যেই দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে দিনের ব্যস্ত সময় ও সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তিও বেড়েছে।
গ্যাস সংকটে ব্যাহত বিদ্যুৎ উৎপাদন
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিকে। দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতাও কমে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অন্যান্য সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ আমদানিতে ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
ফলে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় বিভিন্ন এলাকায় বাধ্যতামূলক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধান কমানো না গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ভোগান্তিতে জনজীবন
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ, পানির পাম্পসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অস্বস্তি বাড়ছে, পাশাপাশি স্বাভাবিক কাজকর্মেও বিঘ্ন ঘটছে।
শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে দোকানপাট, অফিস ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় কাজের সময় কমছে, বাড়ছে পরিচালন ব্যয় এবং লোকসানের আশঙ্কা।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে চাপে শিল্প
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
ফলে একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্প খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন কমে গেলে সরবরাহব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক ব্যয় ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রান্নার গ্যাসের চাপ নিয়েও অভিযোগ
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
একদিকে দীর্ঘ লোডশেডিং, অন্যদিকে গ্যাসের স্বল্প চাপ—দুই ধরনের জ্বালানি সংকট একসঙ্গে জনজীবনে চাপ তৈরি করছে।
স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু সাময়িকভাবে লোডশেডিং কমানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো কঠিন। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘ লোডশেডিং থেকেও দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
তাই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বিদ্যুৎ সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তীব্র গরমের মধ্যে এই সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এর প্রভাব পড়বে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
এখন বড় প্রশ্ন—গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

