‘ইসলামকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল যারা, ইতিহাসে তারাই হারিয়ে গেছে’: আরশাদ মাদানী

‘মাদ্রাসা ও আলেম সমাজের আত্মত্যাগ বাদ দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ নয়’

by ABDUR RAHMAN
আরশাদ মাদানী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার অধিকার কারও নেই বলে মন্তব্য করেছেন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী। তাঁর দাবি, মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপনকারীরাই প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করছে।

বিজ্ঞাপন
banner

১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওবন্দের কাসেমি ময়দান চত্বরে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।

মাওলানা আরশাদ মাদানী বলেন, অতীতে বিভিন্নভাবে মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও বর্তমানে ইসলাম ধর্মকেও সরাসরি নিশানা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যারা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে, শেষ পর্যন্ত তারাই ইতিহাসের গতিতে হারিয়ে গেছে। ইসলাম টিকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

‘স্বাধীনতার ইতিহাস আলেমদের বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ নয়’

ভারতের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে আরশাদ মাদানী বলেন, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি দুর্বল করার যেকোনো উদ্যোগ প্রতিহত করা প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে দারুল উলুম দেওবন্দ, আলেম সমাজ, মাদ্রাসা ও মুসলমানদের আত্মত্যাগও গভীরভাবে যুক্ত। এসব অবদান বাদ দিলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য বুঝতে হলে তাঁদের আত্মত্যাগের দিকে তাকাতে হবে, যারা দেশের মুক্তির জন্য জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮৫৭ সালের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পর ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাদ্রাসাগুলোকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করে মাওলানা মাদানী বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মাদ্রাসা, খানকাহ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

মাদ্রাসার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যারা, তাদের নিজেদের অতীতও ইতিহাসের আয়নায় দেখার আহ্বান জানান তিনি।

কাবুলে গঠিত অস্থায়ী ভারত সরকারে হিন্দু রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে রাষ্ট্রপতি করার ঘটনাটিও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ভারতের স্বাধীনতার বহু আগেই এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল।

মাওলানা আরশাদ মাদানীর অভিযোগ, ভারতের সংবিধান থেকে ‘সেকুলার’ শব্দটি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতে মুসলমানদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ এবং মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার বিষয়টি শুধু একটি সম্প্রদায়ের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং এটি ভারতের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও মাদানী ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের এক বক্তব্যে তিনি সতর্ক করেছিলেন, সংবিধানের মৌলিক মর্যাদা দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেমদের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মাওলানা মাদানী রেশমি রুমাল আন্দোলন এবং মাল্টায় আলেমদের বন্দিত্বের ইতিহাস উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং তাঁদের সহযোদ্ধাদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কারণে মাল্টায় বন্দি রাখা হয়েছিল।

তাঁর প্রশ্ন, যখন আলেমরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করছিলেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করছিলেন, তখন বর্তমানে যারা দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বিতরণ করছেন, তাঁদের আদর্শিক পূর্বসূরিরা কোথায় ছিলেন?

মাদানী বলেন, ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে আলেম সমাজ ও মুসলমানদের আত্মত্যাগের অধ্যায় কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি মুছে দিতে পারবে না।

মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আরশাদ মাদানী বলেন, কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা অন্যায়। তাঁর বক্তব্যে তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার ওপরও জোর দেন।

দারুল উলুম দেওবন্দ ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সঙ্গে যুক্ত মাওলানা আরশাদ মাদানী দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় মুসলমানদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময় তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী তকমা ব্যবহারেরও সমালোচনা করেছেন।

সূত্র: দ্য ইনকিলাব

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ