অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে পর্দাঘেরা একটি রিকশা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, পুরোনো ঢাকার কোনো গলি পেরিয়ে সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বাহনটি আবার ফিরে এসেছে বর্তমানের শহরে। আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা সেই ঐতিহ্যবাহী ‘মহিলা রিকশা’ই এবার ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রায় হয়ে উঠল অন্যতম আকর্ষণ।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে শুরু হওয়া বর্ণিল ‘ঢাকা শোভাযাত্রা’য় শুধু একটি পুরোনো রিকশাই নয়, একসঙ্গে দেখা গেছে স্টিমার, ঘোড়ার গাড়ি ও পালকি। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, খাবার এবং পুরোনো দিনের যাতায়াতব্যবস্থার প্রতীকী উপস্থাপনায় কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন বদলে যায় ঢাকার চেনা নগরচিত্র।
‘ঢাকা দিবস ২০২৬—হৃদয়ে ঢাকা’ এবং ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে এ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। লক্ষ্মীবাজার থেকে শুরু হয়ে নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শোভাযাত্রাটি নগর ভবনে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ।
শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। এ সময় ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন।
ট্রাকে ট্রাকে ঢাকার ইতিহাস
শোভাযাত্রার বিভিন্ন ট্রাকে তুলে ধরা হয় ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রতিকৃতি। এর মধ্যে ছিল আহসান মঞ্জিল, ঢাকেশ্বরী মন্দির, তারা মসজিদ, আর্মেনিয়ান গির্জা, জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও লালবাগ কেল্লা।
এ ছাড়া বড় ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, লালকুঠি, বৌদ্ধ মন্দির এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা গেট। ফলে শোভাযাত্রাটি শুধু উৎসবের আমেজ তৈরি করেনি, একই সঙ্গে নগরবাসীর সামনে তুলে ধরেছে ঢাকার ইতিহাসের নানা অধ্যায়।
ইতিহাসের চরিত্রে বর্তমানের মানুষ
ঢাকার পত্তন ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরও প্রতীকীভাবে হাজির করা হয় শোভাযাত্রায়। অংশগ্রহণকারীদের কেউ সাজেন রানী ভিক্টোরিয়ার আদলে, কেউ নবাব খাজা আহসানউল্লাহ, লীলা নাগ (রায়), নিকোলাস পোগোজ, জিন্নাবাই ও পরিবিবির মতো ঐতিহাসিক চরিত্রের বেশে।
ফলে একই শোভাযাত্রায় বর্তমান সময়ের মানুষের পাশাপাশি যেন চোখের সামনে ফিরে আসে ঢাকার অতীতের পরিচিত মুখগুলো। ইতিহাসের চরিত্র ও পুরোনো স্থাপনার এমন উপস্থাপন আয়োজনটিকে দেয় ভিন্নমাত্রা।
পুরান ঢাকার খাবারেও ঐতিহ্যের ছোঁয়া
ঢাকার সংস্কৃতির সঙ্গে খাবারের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তাই শোভাযাত্রায় বাদ যায়নি পুরান ঢাকার খাদ্যঐতিহ্য। সেখানে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয় বাকরখানি, নান্না বিরিয়ানি ও বিউটি লাচ্ছির মতো পরিচিত খাবার ও ব্র্যান্ডের উপস্থাপনা।
স্থাপত্য ও ইতিহাসের পাশাপাশি এসব খাবারের উপস্থিতি পুরান ঢাকার স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতিকেও সামনে নিয়ে আসে।
বিশেষ আকর্ষণ ‘মহিলা রিকশা’
পুরোনো দিনের যাতায়াতব্যবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শোভাযাত্রার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপাদান ছিল পর্দাঘেরা ‘মহিলা রিকশা’। একসময় ঢাকার রাস্তায় এ ধরনের রিকশা পরিচিত দৃশ্য ছিল। বিশেষ করে নারীদের চলাচলের ক্ষেত্রে পর্দাঘেরা রিকশার ব্যবহার পুরোনো নগরজীবনের একটি পরিচিত অনুষঙ্গ।
সময়ের সঙ্গে নগরজীবন ও পরিবহনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক যানবাহনের বিস্তারে সেই রিকশা এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। তাই শোভাযাত্রায় এর উপস্থিতি অনেকের কাছেই পুরোনো ঢাকার স্মৃতিকে নতুন করে সামনে আনার মতো ছিল।
এর পাশাপাশি ঘোড়ার গাড়ি, পালকি ও স্টিমারের প্রতীকী উপস্থাপনাও ঢাকার অতীতের যাতায়াতব্যবস্থার নানা অধ্যায়কে মনে করিয়ে দেয়।
পুরোনো ও নতুন ঢাকা একসঙ্গে দেখা
ডিএসসিসির মাসব্যাপী ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ২৮ আগস্ট লক্ষ্মীবাজার থেকে নগর ভবন পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, ভিনটেজ গাড়ি ও পালকিসহ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
শুক্রবারের আয়োজনে স্থাপনা, ঐতিহাসিক চরিত্র, খাবার ও পুরোনো দিনের বাহনের প্রতীকী উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয় অতীত ও বর্তমানের এক অভিনব সংযোগ। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নগরবাসীও আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করেন পুরো আয়োজন।
একদিকে ছিল আধুনিক ঢাকার ব্যস্ততা, অন্যদিকে শোভাযাত্রার ভেতর দিয়ে উঠে আসে পুরোনো নগরের স্মৃতি। ফলে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে যেন ঢাকার দীর্ঘ ইতিহাসের একটি চলমান প্রদর্শনী।
৪১৬ বছরের ঢাকা এভাবেই শুধু নিজের বয়স উদ্যাপন করেনি; বরং নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে নতুন করে মানুষের সামনে হাজির করেছে। পর্দাঘেরা ‘মহিলা রিকশা’, ঘোড়ার গাড়ি, পালকি ও স্টিমার থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক স্থাপনা, ব্যক্তিত্ব ও খাবারের প্রতিকৃতি—সব মিলিয়ে শোভাযাত্রাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, ঢাকা বদলেছে, নগরজীবন বদলেছে, কিন্তু এই শহরের অতীত এখনো মানুষের স্মৃতি ও আবেগে জীবন্ত।
আর/

