ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অগ্রগতি, সফল হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA টিকা

মডার্না-মার্কের ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA টিকা মেলানোমার পুনরাবৃত্তি ও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমিয়েছে

by ABDUR RAHMAN
সফল হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA টিকা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

ক্যানসারের বিরুদ্ধে টিকা তৈরির দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় বড় ধরনের অগ্রগতির খবর এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও মার্কের যৌথভাবে তৈরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA-ভিত্তিক ক্যানসার থেরাপি ‘ইন্টিসমেরান অটোজিন’ (Intismeran Autogene) মেলানোমা চিকিৎসায় ফেজ-৩ পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখিয়েছে। এটি ক্যানসার প্রতিরোধের প্রচলিত টিকা নয়; বরং অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার ফিরে আসা বা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য রোগীর নিজের টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি একটি চিকিৎসা।

বিজ্ঞাপন
banner

১৯ আগস্ট ২০২৬ মডার্না ও মার্ক জানায়, INTerpath-001 নামের ফেজ-৩ পরীক্ষায় ইন্টিসমেরান অটোজিনের সঙ্গে কিট্রুডা (pembrolizumab) ব্যবহারে পরীক্ষার প্রধান লক্ষ্য—ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো—এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় লক্ষ্য—দূরবর্তী স্থানে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো—দুটিই পূরণ হয়েছে। কোম্পানি দুটির দাবি, এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিওঅ্যান্টিজেন থেরাপি এবং mRNA-ভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসার প্রথম ইতিবাচক ফেজ-৩ ফল।

কীভাবে কাজ করে এই টিকা?

ইন্টিসমেরান অটোজিন কোনো ভাইরাস বা সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য তৈরি নয়। প্রথমে রোগীর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সেই ক্যানসারে থাকা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন বা ‘মিউটেশন’ শনাক্ত করে রোগীর জন্য আলাদাভাবে mRNA-ভিত্তিক থেরাপি তৈরি করা হয়। এতে সর্বোচ্চ ৩৪টি নিওঅ্যান্টিজেনকে লক্ষ্য করার জন্য রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রশিক্ষিত করা যায়।

এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয় মার্কের ইমিউনোথেরাপি কিট্রুডা। কিট্রুডা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার টি-সেলকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে সহায়তা করে। আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA থেরাপি ওই রোগীর ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য চিনে নিতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দেশনা দেয়। অর্থাৎ একটি চিকিৎসা প্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করে, অন্যটি ক্যানসার কোষকে শনাক্ত করার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু দেয়।

ফেজ-৩ পরীক্ষায় কী ফল পাওয়া গেছে?

INTerpath-001 পরীক্ষায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা উচ্চঝুঁকির স্টেজ IIB থেকে IV মেলানোমার রোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরীক্ষায় ১ হাজারের বেশি রোগী অংশ নেন এবং তাদের একদল কিট্রুডা পান, অন্যদল কিট্রুডার সঙ্গে ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA থেরাপি পান। প্রাথমিক ফলাফলে যৌথ চিকিৎসায় মেলানোমা ফিরে আসা এবং দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কিট্রুডা একা ব্যবহারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এর আগে ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত পাঁচ বছরের ফলোআপ তথ্যেও ইন্টিসমেরান ও কিট্রুডার সমন্বিত চিকিৎসায় ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ এবং দূরবর্তীভাবে ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৯ শতাংশ কমার তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেটি ছিল ফেজ-২বি গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ; নতুন ফেজ-৩ ফলাফল আরও বড় পরিসরে এই পদ্ধতির কার্যকারিতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে।

মেলানোমাকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?

মেলানোমাকে এই গবেষণার জন্য বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এ ধরনের ক্যানসারে অন্যান্য অনেক ক্যানসারের তুলনায় জিনগত পরিবর্তনের সংখ্যা বেশি। ফলে রোগীর টিউমার বিশ্লেষণ করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য একাধিক সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ।

এ ছাড়া মেলানোমার চিকিৎসায় কিট্রুডার কার্যকারিতারও দীর্ঘদিনের রেকর্ড রয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর টিউমারের নমুনা বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক থেরাপি তৈরির সুযোগ থাকায় মেলানোমা এই প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য উপযোগী একটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

শত বছরের ব্যর্থতার পর কেন এবার সম্ভাবনা তৈরি হলো?

ক্যানসারের বিরুদ্ধে টিকা তৈরির ধারণা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্যানসারের জটিল জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা এবং একই সঙ্গে রোগীর জন্য দ্রুত আলাদা চিকিৎসা তৈরি করা দীর্ঘদিন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

জিনগত সিকোয়েন্সিংয়ের প্রযুক্তির অগ্রগতি, খরচ কমে যাওয়া এবং mRNA প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সেই বাধা অনেকটাই কমিয়েছে। ফলে রোগীর ক্যানসারের নিজস্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য আলাদা থেরাপি তৈরির ধারণা এখন বাস্তব ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় সাফল্যের মুখ দেখছে।

সামনে আরও বড় পরীক্ষা

তবে এই সাফল্যকে ক্যানসারের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখনো সামগ্রিকভাবে বেঁচে থাকার (overall survival) তথ্যসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনও প্রয়োজন। মডার্না ও মার্ক ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মেলানোমার বাইরে কম জিনগত মিউটেশনযুক্ত ক্যানসারে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর হবে। ফুসফুস, কিডনি, মূত্রথলি, অগ্ন্যাশয়সহ বিভিন্ন ক্যানসারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক mRNA থেরাপি নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। তবে সম্প্রতি অন্য একটি mRNA ক্যানসার টিকার কোলোরেক্টাল ক্যানসার ট্রায়াল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে যে সব ধরনের ক্যানসারে একই পদ্ধতি সমানভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।

ক্যানসারের চিকিৎসায় তাই এই সাফল্যকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি বৃহত্তর পরীক্ষায় কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন পাওয়া যায়, তাহলে রোগীর ক্যানসারের ধরন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদাভাবে তৈরি চিকিৎসা ক্যানসার চিকিৎসার প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স, মার্ক

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ