নিজস্ব প্রতিবেদক | হুদহুদ নিউজ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক বলেছেন, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল সোনারগাঁওয়ের রয়েল রিসোর্টে তাকে ঘিরে সংঘটিত হামলা ও ষড়যন্ত্র ছিল পরিকল্পিত। তবে ওই পরিস্থিতিতে দল-মত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত গণঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব। এই ঐক্যই সেদিনের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মামুনুল হক। সাহসী জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, দীর্ঘদিন জেল-জুলুম ও হয়রানির শিকার মজলুমদের সম্মান এবং বীর শহীদ মাওলানা ইকবাল হোসাইন (রহ.)-এর স্মরণে এ সভার আয়োজন করা হয়।
মামুনুল হক বলেন, সেদিন কোনো পূর্বঘোষণা বা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই হাজার হাজার মানুষ সেখানে ছুটে এসেছিলেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ইসলামী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রেমী মানুষও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
তার মতে, সেদিনের ঐক্যকে কোনো একটি দলের পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলে সেই সময়ের জনতার অবদানকে অসম্মান করা হবে।
রয়েল রিসোর্টের ঘটনার প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ষড়যন্ত্রকারীরাই তার সহযোগিতা চায় বলে দাবি করেন তিনি।
জনগণকে শান্ত করার জন্য তিনি ফেসবুকে লাইভে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পরে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে বিক্ষুব্ধ মানুষের সামনে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ৩ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সোনারগাঁওয়ে যে দল-মতনিরপেক্ষ গণঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটিই বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। দেশের স্বার্থ ও ইসলামের স্বার্থে এই ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মামুনুল হক বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। সরকারি দল ও বিরোধী দল নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে। তবে দেশ ও ইসলামের স্বার্থে দলীয় সংকীর্ণতা কাউকে বিভক্ত করতে পারে না।
কোনো দেশপ্রেমিক বা ইসলামপ্রেমী মানুষ আক্রান্ত হলে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
সোনারগাঁওয়ের ঘটনার পর মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রসঙ্গ তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, সোনারগাঁও, গজারিয়া, বন্দর, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকার রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আলেম-ওলামা এবং সাধারণ মানুষ মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এতে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব মজলুম মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। কারাগারে থাকাকালেও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন দাবি করে মামুনুল হক বলেন, যাদের মামলা পরিচালনার মতো কেউ ছিল না, তাদের আইনি সহায়তার দায়িত্ব নিতে তিনি আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
২০২১ সালের ঘটনার কারণে এখনো কেউ মামলা-মোকদ্দমা বা অন্য কোনো ক্ষতির মুখে থাকলে তাদের একা না ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
বীর শহীদ মাওলানা ইকবাল হোসাইন (রহ.)-এর স্মরণে মামুনুল হক বলেন, ফ্যাসিবাদী জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন। তিনি কারাগারে থাকায় ইকবাল হোসাইনের শাহাদাতের খবরও যথাসময়ে জানতে পারেননি বলে উল্লেখ করেন।
শহীদ ইকবাল হোসাইন (রহ.)-এর আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।
মামুনুল হক বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও ঈমানি ভ্রাতৃত্ব, দেশপ্রেম ও ইসলামপ্রেমের জায়গায় সবাই এক। এই পরিচয়েই তারা অতীতে মজলুমদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাহসী জনগণ ও মজলুমদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, দীর্ঘদিন পর তাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞ। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতে অনেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে না পারায় দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মাওলানা উবায়দুল কাদের নদভীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, ময়মনসিংহ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদুল্লাহ, বিএনপির নারায়ণগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক ও জেলা প্রশাসক মামুন মাহমুদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল, মাওলানা এনামুল হক মুসা এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি মাওলানা মামুনুর রশীদসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

