অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
জাতীয় সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। সংসদে এক সদস্যের বক্তব্যের সময় অন্য সদস্যদের বাধা দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, এ ধরনের আচরণ সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় স্পিকার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতেই সংসদের শৃঙ্খলা, বক্তব্য দেওয়ার স্বাধীনতা এবং কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণের বিষয়ে সদস্যদের সতর্ক করেন তিনি।
স্পিকার বলেন, অনেক কষ্ট, ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। এই গণতন্ত্র যাতে কার্যকর থাকে এবং বহাল থাকে, সে দায়িত্ব সংসদের প্রত্যেক সদস্যের রয়েছে।
তিনি সংসদ সদস্যদের ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বা কার্যপ্রণালী বিধি পড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্পিকার যখন কথা বলেন, তখন সবাইকে বসে তা শুনতে হয়। সংসদের নির্ধারিত আইন ও নিয়ম না মানা হলে এবং তা ভঙ্গ করার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদ বেশিদিন চলতে পারবে না।
স্পিকার বলেন, “আমি এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আজকে একে অপরকে কথা বলার সুযোগকে যেভাবে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখেছি, এটা সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ না।”
তিনি আরও বলেন, সংসদ হচ্ছে কথা বলার জায়গা। এখানে যুক্তির মাধ্যমে একে অপরের বক্তব্য খণ্ডন করা যাবে। তবে কারও কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না। শব্দ ও হইচইয়ের মাধ্যমে ‘বিচারের বাণীকে’ স্তব্ধ করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধিবেশনের শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়।
কুমিল্লা-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রশ্নটি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, “স্পিকার, এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর বিরোধীদলীয় সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান। একপর্যায়ে সংসদে হইচই ও হট্টগোল শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যদি কথাই না বলতে দেন, তাহলে কীসের বাকস্বাধীনতা।”
এরপর বিরোধীদলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ওই অংশ এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানানো হয়। আপত্তি ও হট্টগোলের কারণে প্রায় ১০ মিনিট সংসদের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তার বক্তব্যে এভাবে মন্তব্য করা হলে সংসদে তার বক্তব্য দেওয়ারই প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন করে এ ধরনের শব্দের ব্যবহার শুরু করেছেন এবং শুরু থেকেই সংসদে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিচ্ছেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “উনি নিজেকে কী মনে করেন।”
শফিকুর রহমান আরও বলেন, “উনি শিক্ষক হলে তিনি ইউনিভার্সিটি খুলুন, সেখানে উনি বক্তব্য দিতে পারবেন। এটা ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের জন্য তাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে বলেও দাবি করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বলেন, সংসদে কথা বলার স্বাধীনতা সবার রয়েছে। তবে সংসদের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রত্যেক সদস্যকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা দাঁড়ানোর পর তার পেছনে একসঙ্গে অনেক সদস্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাদের বসানোও সম্ভব হচ্ছিল না। এ ধরনের পরিস্থিতি সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে।
তিনি বলেন, “সংসদ কথা বলার জায়গা। কথার মাধ্যমে একে অপরের যুক্তিকে খণ্ডন করা যাবে।”
বিরোধীদলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার বা এক্সপাঞ্জের যে দাবি এসেছে, তা খতিয়ে দেখার কথাও জানান স্পিকার। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনোভাবেই একে অপরের কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না।
সংসদ পরিচালনায় নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি তার জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সংসদ পরিচালনার চেষ্টা করছেন। গত ৪০ বছর ধরে জাতীয় সংসদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
স্পিকার বলেন, অতীতেও সংসদে অনেক খারাপ রেকর্ড রয়েছে। তবে অতীতের তুলনায় বর্তমান সংসদকে ভালো সংসদ হিসেবে দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি সংসদের উভয় পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলা জরুরি।
সবশেষে স্পিকার সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সংসদের মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, নিয়ম-নীতি ভঙ্গের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদের কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হয়ে পড়বে।

