ইসরাইলের আধিপত্যে পাশ কাটিয়ে নতুন জোট গড়ছে মধ্যপ্রাচ্য

সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও প্রতিবেশীদের আস্থা, আন্তর্জাতিক বৈধতা ও স্বতন্ত্র কূটনৈতিক প্রভাব তৈরিতে ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে; উল্টো আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের নতুন নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলছে।

by ABDUR RAHMAN
ইসরাইলের আধিপত্যে পাশ কাটিয়ে নতুন জোট গড়ছে মধ্যপ্রাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তির বিচারে ইসরাইল এখনো অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ধারাবাহিকতায় দেশটি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিগত শক্তির ব্যাপকতা দেখিয়েছে। কিন্তু সামরিক আধিপত্য আর আঞ্চলিক নেতৃত্ব এক বিষয় নয়। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে বা বাধ্য করে সিদ্ধান্ত মানানো সম্ভব হলেও, তাদের স্বেচ্ছায় নিজের নেতৃত্বের অধীনে আনা অনেক বেশি কঠিন। ইসরাইলের বর্তমান অবস্থানকে ঘিরে মূল প্রশ্নটি সেখানেই।

বিজ্ঞাপন
banner

দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির ধারণা অনুযায়ী, ‘ডমিনেশন’ হলো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা; আর ‘হেজিমনি’ হলো এমন নেতৃত্ব, যা অন্যদের সম্মতি ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরাইলের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সামরিক শক্তি ব্যাপক হলেও সেই শক্তি এখনো পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ইসরাইলকেন্দ্রিক করে তুলতে পারেনি।

২০২৩ সালের পর গাজা যুদ্ধ, লেবানন ও সিরিয়ায় সামরিক তৎপরতা এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত ইসরাইলের প্রতিরোধক্ষমতার ব্যাপকতা তুলে ধরেছে। তবে এসব সামরিক সাফল্য আঞ্চলিক ঐকমত্য তৈরির সমান নয়। বরং সংঘাত যত দীর্ঘ হয়েছে, ইসরাইলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও কূটনৈতিক চাপও তত বেড়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও এই সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। ৯ আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনা ইসরাইল প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইল গাজা থেকে প্রত্যাহার করবে না। অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে তেল আবিবের অবস্থানের পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইসরাইলকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। ৮ আগস্ট ২০২৬ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়; তবে এতে তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে অন্য দেশও এতে যুক্ত হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইসরাইলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের জরিপে ৩৬টি দেশের অধিকাংশেই ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মত ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যে ৬৯ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৩ শতাংশ, ইতালিতে ৭৫ শতাংশ এবং স্পেনে ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মত দিয়েছেন। ২০২৫ সালের তুলনায় বেশ কয়েকটি দেশেই এই নেতিবাচক মনোভাব আরও বেড়েছে।

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতেও ইসরাইলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাত আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। তবে এই সংযুক্তিই আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে—ইসরাইল প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রযুক্তি, অর্থ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর কোনো শক্তি নয়।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা শাখা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের হিসাবে, ১৯৪৬ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বর্তমান মূল্যে প্রায় ১৭৪.৯৬৫ বিলিয়ন ডলার সামরিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়েছে। ফলে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বিশ্লেষণে মার্কিন সহায়তা ও নিরাপত্তা কাঠামোকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের অবস্থান নিয়ে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে। আগস্টের শুরুতে সৌদি আরব, মিসর, তুরস্ক, কাতার, জর্ডান, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ গাজায় ইসরাইলি সামরিক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায়। ইসরাইল অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামাসের সামরিক তৎপরতার কথা উল্লেখ করেছে। ফলে যুদ্ধবিরতি ও গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আঞ্চলিক ঐকমত্য এখনো অধরা।

সব মিলিয়ে ইসরাইলের সামনে একটি বড় বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় দেশটি অত্যন্ত প্রভাবশালী; কিন্তু সেই শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নেতৃত্বে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, কাতার, পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে পৃথক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ফলে ইসরাইলের প্রভাব আছে, কিন্তু পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ইসরাইলকেন্দ্রিক করে তোলার মতো গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এটিকে ইসরাইলের অবিলম্বে পতনের লক্ষণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং বিষয়টি হলো—সামরিক আধিপত্য ও আঞ্চলিক হেজিমনির মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামরিক শক্তি ইসরাইলকে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে রাখতে পারে। কিন্তু সেই শক্তির পাশাপাশি যদি আন্তর্জাতিক বৈধতা ও প্রতিবেশীদের আস্থা কমতে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কাঠামো ইসরাইলকে কেন্দ্র করে নয়, বরং তাকে পাশ কাটিয়েই গড়ে উঠতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ