ভারতের শত শত কৃষিপণ্যে ক্যানসার উপাদান, ইউরোপে একের পর এক প্রত্যাখ্যান

নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগ; জনস্বাস্থ্য ও রপ্তানি খাত নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

by ABDUR RAHMAN
ভারতের শত শত কৃষিপণ্যে ক্যানসারঝুঁকির উপাদান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

ভারতের কৃষি ও খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া শত শত কৃষি ও খাদ্যপণ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

ইউরোপীয় কমিশন ও ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশ ভারতের অন্তত ৩৬৫টি কৃষিজাত পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এসব পণ্যে ক্ষতিকর কীটনাশক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়েও ভারত-সংশ্লিষ্ট ৫২৭টি খাদ্যপণ্যে ক্যানসারঝুঁকির রাসায়নিক শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। এসব পণ্যের মধ্যে ৩১৩টি ছিল বাদাম ও তেলবীজজাত পণ্য, ৬০টি ভেষজ ও মসলা, ৪৮টি ডায়েটিক খাদ্য এবং বাকি পণ্যগুলো অন্যান্য খাদ্যশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা র‌্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড (RASFF) জানিয়েছে, বহু খাদ্যপণ্যে ইথিলিন অক্সাইড নামের একটি রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাধারণত চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করতে ব্যবহৃত এই রাসায়নিক খাদ্যে প্রবেশ করলে লিম্ফোমা ও লিউকেমিয়ার মতো ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথিলিন অক্সাইড ছাড়াও কিছু পণ্যে ইথিলিন গ্লাইকলের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে, ভারতের কৃষিক্ষেত্রে এমন কয়েকটি কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহৃত হচ্ছে, যেগুলোর অনেকগুলোই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে প্যারাকোয়াট, গ্লাইফোসেট, ২,৪-ডি, ডাইমেথোয়েট এবং অ্যাসিফেট।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’-এর অন্যতম উপাদান ২,৪-ডি বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বিতর্কিত হিসেবে বিবেচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা এটিকে সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

প্যারাকোয়াট নামের আগাছানাশকটি বর্তমানে অন্তত ৭৪টি দেশে নিষিদ্ধ। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, সামান্য পরিমাণ প্যারাকোয়াট শরীরে প্রবেশ করলেও ফুসফুস ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি এটি পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর সঙ্গেও যুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্লাইফোসেট নিয়েও বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (IARC) এটিকে সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। এ নিয়ে বিভিন্ন দেশে একাধিক মামলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়েছে।

পরিবেশবিদদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ অ্যাসিফেট। তুলা, শাকসবজি ও ডাল চাষে বহুল ব্যবহৃত এই কীটনাশক মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী উপকারী পোকামাকড়ের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে ফল, সবজি ও তৈলবীজ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভারতে ক্যানসারও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশটিতে প্রায় ১৪ লাখ ৬০ হাজার নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সমালোচকদের প্রশ্ন, যেসব রাসায়নিক ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের বহু দেশে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকির কারণে নিষিদ্ধ, সেগুলোর ব্যবহার উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষিখাতে এখনও কেন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা আরও কঠোরভাবে পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ