অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া বিরল অ্যালবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ এখন রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে চিড়িয়াখানায় আসা দর্শনার্থীদের বড় একটি অংশকে দেখা গেছে মহিষটির খাঁচার সামনে ভিড় করতে। অনেকেই অন্য প্রাণী দেখার আগে কিংবা পরে একবার অন্তত ‘এল-০৭’ নম্বর খাঁচায় গিয়ে আলোচিত এই মহিষটিকে দেখে আসছেন।
চিড়িয়াখানার প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন অংশে দর্শনার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল দেখা গেছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে ঘিরে। কেউ খাঁচার অবস্থান জানতে চাইছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ নাম ধরে ডাকছেন মহিষটিকে। খাঁচার সামনে টাঙানো পরিচিতি বোর্ডে বাংলায় ‘সাদা মহিষ (ডোনাল্ড ট্রাম্প)’ এবং ইংরেজিতে ‘Albino Buffalo’ লেখা রয়েছে।

দর্শনার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মহিষটিকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখেই তারা এটি দেখতে আগ্রহী হয়েছেন। রূপনগর থেকে আসা শিক্ষার্থী আজমিরা আক্তার বলেন, খবরে দেখে যেমন মনে হয়েছিল, বাস্তবেও মহিষটিকে তেমনই দেখাচ্ছে। অন্যদিকে মিরপুরের বাসিন্দা মেহেদী হাসান জানান, আগে থেকেই বিষয়টি জানতেন বলে চিড়িয়াখানার ভেতরে খোঁজ নিয়ে খাঁচাটি খুঁজে বের করেছেন। দর্শনার্থী আসাদুজ্জামান কানন বলেন, মহিষটির চুল ও গায়ের রঙের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছুটা মিল রয়েছে বলেই মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. আতিকুর রহমান জানান, ঈদের আগের রাতে মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় আনা হয়। নতুন প্রাণী হওয়ায় সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। পরিবহনের সময় মহিষটির শরীরে সামান্য আঁচড় লাগলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে এটি সুস্থ রয়েছে।
চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের বাড়তি ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ পরিদর্শক বিষ্ণু ব্রত মল্লিক বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে খাঁচার সামনে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে শুধু প্রদর্শনীর জন্য নয়, গবেষণার উদ্দেশ্যেও মহিষটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্যের এই মহিষের জিনগত ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা হবে। পাশাপাশি মহিষের জাত উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হবে। তার দাবি, অন্তত ২০০০ সালের পর থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানার রেকর্ডে আগে কখনও মহিষ সংরক্ষণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে লালন-পালন করা হচ্ছিল আলোচিত এই মহিষটিকে। এর সাদা বর্ণ ও মাথার চুলের গঠন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিল থাকায় খামার কর্তৃপক্ষ এর নাম রাখে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এটি দেশ-বিদেশে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর বাজারেও ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মহিষটি।
পরবর্তীতে মহিষটিকে কেরানীগঞ্জে নেওয়া হলেও ঈদের আগের দিন সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে এটিকে জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থানান্তর করা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী উদাহরণ হওয়ায় মহিষটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, অ্যালবিনো কোনো মহিষের জাত নয়; এটি একটি জেনেটিক বৈশিষ্ট্য। জিনগত পরিবর্তনের কারণে শরীরে মেলানিন উৎপাদন কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে প্রাণীর গায়ের রঙ সাদা কিংবা হালকা গোলাপি হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিম্যাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের প্রধান ড. মো. মুনির হোসেন বলেন, অ্যালবিনিজম মূলত একটি বিরল জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বা ডিসঅর্ডার। এটি শুধু মহিষ নয়, সাপ, ইঁদুর, সরীসৃপ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও দেখা যেতে পারে।
প্রাণিসম্পদ গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অ্যালবিনো মহিষ খুব বেশি দেখা যায় না। ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এ ধরনের মহিষ তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেলেও দেশে এটি বিরল বলেই বিবেচিত হয়। সংশ্লিষ্ট গবেষকরা জানান, সাদা বা গোলাপি বর্ণের অ্যালবিনিজমের ঘটনা তুলনামূলকভাবে আরও কম দেখা যায়।
এদিকে রাবেয়া অ্যাগ্রোর কর্মচারী মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের খামারে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’সহ মোট ছয়টি অ্যালবিনো মহিষ ছিল এবং ঈদের আগে সবগুলোই বিক্রি হয়ে গেছে। মহিষগুলো রাজশাহীর একটি পশুর হাট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
গবেষকদের মতে, মহিষের দুধে চর্বি ও প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় মহিষভিত্তিক গবেষণা দেশের দুগ্ধশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্যের এই মহিষকে ঘিরে ভবিষ্যতে নতুন গবেষণার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আর/

