মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশেও তেলের মজুদ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও সরকার বারবার আশ্বস্ত করছে যে কোনো সংকট নেই, তবুও দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গত কয়েকদিন ধরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন। এছাড়া ৭ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ আছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা থাকায় বর্তমান মজুদ দিয়ে প্রায় ১১ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া—প্রতিদিন যেমন তেল সরবরাহ হচ্ছে, তেমনি বিদেশ থেকে নতুন চালানও আসছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশে ডিজেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই এবং পাম্পে দীর্ঘ লাইন মূলত ‘মনস্তাত্ত্বিক’ কারণে তৈরি হয়েছে। তবে সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের আশঙ্কা থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযানও চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক M Tamim মনে করেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতা ৩০–৪০ দিনের বেশি নয়। তিনি কৌশলগত মজুদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে সতর্ক করেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মাঠ পর্যায়ে গ্রাহক ও পাম্প মালিকদের মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। অন্যদিকে পাম্প মালিকরা বলছেন, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা জনরোষের মুখে পড়ছেন।
এদিকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে সরকার।
সব মিলিয়ে সরকার সংকট না থাকার দাবি করলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির ওপর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে আমদানি অব্যাহত থাকলে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে পাম্পগুলোর দীর্ঘ লাইন দ্রুতই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর/

