যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে তেল রপ্তানিনির্ভর উপসাগরীয় দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই জ্বালানি রপ্তানি খাতে এসব দেশের সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জ্বালানি বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার এবং উড ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়াই এই বিপুল ক্ষতির প্রধান কারণ।
বন্ধ হরমুজ প্রণালি, প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষতি
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কোটি ডলার সমমূল্যের অপরিশোধিত তেল, গ্যাস ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন করা হতো।
তবে ইরানি হামলা এবং জাহাজের বিমা খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পারস্য উপসাগরে লাখ লাখ ব্যারেল জ্বালানি আটকা পড়ে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য যুদ্ধ কত বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ এসব দেশের সরকারি আয়ের বড় অংশই জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা সৌদি আরবের
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটি প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি আয় হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
অন্যান্য দেশও বড় ক্ষতির মুখে
অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশ তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ইরাক বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির সরকারি রাজস্ব আদায়ে বড় ধস নেমেছে।
অন্যদিকে, গত ২ মার্চ থেকে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ থাকায় কাতার এনার্জি প্রায় ৫৭ কোটি ১০ লাখ ডলার রাজস্ব হারিয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইনও কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে। তবে তারা তাদের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ব্যবহার করে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
জাহাজে আটকে বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের তেল ও এলএনজি জাহাজে বোঝাই অবস্থায় হরমুজ প্রণালির ভেতরেই আটকে আছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে অনেক ক্রেতা আগেই এসব জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করেছে। কিন্তু সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
বিকল্প পথেও সীমাবদ্ধতা
সৌদি আরামকো তাদের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরে তেল পাঠানোর পাইপলাইন ব্যবহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও বিশ্লেষকদের মতে এটি সহজ হবে না।
উড ম্যাকেঞ্জির মতে, এই পাইপলাইন কখনোই পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হয়নি। তাই এটি দিয়ে পুরো রপ্তানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর
বিশ্লেষকদের মতে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো আপাতত বড় অঙ্কের রাজস্ব হারালেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে তারা কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
তবে এর প্রকৃত মূল্য দিতে হবে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পখাতকে। কারণ তাদেরই কয়েক গুণ বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

