মাদ্রাসা মানেই কেবল পুঁথিগত বিদ্যা আর কিতাব পাঠ এমন প্রচলিত ধারণা ভেঙে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাজধানীর দক্ষিণখানের নগরিয়া বাড়ির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘মাদরাসাতুল কোরআন’। মাদরাসাটির ‘মাদানি নেসাব’ ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের তৈরি করা দৃষ্টিনন্দন হস্তশিল্প এখন নজর কাড়ছে সবার।
পড়াশোনার ফাঁকে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতাকে প্রাণ দিতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আয়োজন করে বিশেষ হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ। শিক্ষার্থীদের তৈরি করা প্রতিটি কাজ যেন একেকটি নীরব গল্প যেখানে ফুটে উঠেছে শৈল্পিক রুচি আর ধৈর্যের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ।
শৈল্পিক কাজের বিচিত্র সম্ভার শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনীতে দেখা গেছে বাহারি সব সৃজনশীল কর্ম। যার মধ্যে রয়েছে, সাধারণ কার্ডবোর্ড ও কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন নিখুঁত রেপ্লিকা। রঙিন সুতো, বাঁশ ও অব্যবহৃত সামগ্রী ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় ফুলদানি, কলমদানি ও ওয়ালম্যাট।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মুহাম্মদ সাঈদ আল-মামুন বলেন, কল্পনাও করতে পারিনি হস্তশিল্পের কাজ আমরা পারবো। কিন্তু আমাদের শিক্ষক বলে দেয়ার পর আমরা সহজেই বানিয়ে ফেলি।
আরেক শিক্ষার্থী মাহমুদ বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান অন্যন্যা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা এখানে শিক্ষার্থীদের হাতে ধরে পড়া-শোনাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় স্কিল শেখানো হয়।
প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া নাদিম তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, আমরা সারা দিন আরবি ভাষা, বাংলা, গণিত ও ইংরেজি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু যখন হাতের কাজগুলো শিখি, তখন মনের মধ্যে অন্যরকম প্রশান্তি কাজ করে।
রিফাত বলেন, আমাদের শিক্ষকরা আমাদের শিখিয়েছেন যে, দ্বীনি ইলম অর্জনের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার দক্ষতা থাকাও জরুরি।
জুবায়ের বলেন, নিজের হাতের তৈরি জিনিস যখন পূর্ণতা পায়, তখন আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। আরও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন নাঈমসহ অন্য শিক্ষার্থীর।
মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব মাওলানা আমির হামজা বলেন, ইসলাম পরিচ্ছন্ন রুচিবোধ এবং কর্মমুখী হওয়ার শিক্ষা দেয়। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের একঘেয়েমি দূর করা এবং তাদের সুপ্ত মেধা বিকশিত করা। একজন ছাত্রকে সমাজের জন্য উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। এ প্রতিষ্ঠান গতানুগতিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সর্বাত্মক কাজ করা হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অত্র প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ড. মোস্তফা মঞ্জুর। তিনি এই প্রদর্শনী সম্পর্কে বলেন, মাদরাসাতুল কোরআনের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। আধুনিক বিশ্বে একজন আলেমকে কেবল ধর্মীয় জ্ঞান রাখলেই চলে না, বরং সমকালীন দক্ষতা ও সৃজনশীলতায় পারদর্শী হতে হয়। আর এ কাজ মাদরাসাতুল কোরআন কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছেন।
পড়ালেখার নানা সুযোগ
মেধা ও কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে এই প্রতিষ্ঠানে বৃত্তির সুযোগ আছে। দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনাও দেয়া হয়। সাপ্তাহিক বক্তৃতা, প্রশিক্ষণ, লেখালেখি, কম্পিউটার, আবৃত্তি, হামদ-নাতসহ বিভিন্ন দক্ষতায় গড়ে তোলা হয় নিবিড় যত্নে।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
এ প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী কওমি, মাদানি এবং আলিয়া তিনটি ধারার পরীক্ষাতেই অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। ফলে তার জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সবসময় খোলা থাকে। তারা মদিনা, কাতার, তুরস্ক কিংবা মালয়েশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ থেকে শুরু করে দেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েটের মতো শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দাপটের সঙ্গে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। উচ্চশিক্ষার কোনো পথই তাদের জন্য রুদ্ধ থাকবে না।
তারা হবে আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ দাঈ, সুবক্তা, তুখোড় লেখক এবং কুশলী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। আধুনিক যুগের যে-কোনো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা হবে অবিচল ও অকুতোভয়।
এ প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষার্থীদের আর্তমানবতার সেবা এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
ভর্তি চলছে মাদানি নেসাব প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে। পর্যায়ক্রমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থীদের দাখিল (SSC) ও আলিম (ALIM) পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

