ইউএনও কার্যালয়ে হামলা: নাটোরে ২৫ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, পরদিনই ডিসি-ইউএনওর রদবদল

লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক দুটি এজাহার; বদলির কারণ জানায়নি সরকার

by ABDUR RAHMAN
ইউএনও কার্যালয়ে হামলা

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়েরের একদিন পরই জেলা প্রশাসক (ডিসি) আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনও মো. বরকত উল্লাহকে বদলি করা হয়েছে। একই সময়ে দুই কর্মকর্তার প্রশাসনিক রদবদলের ঘটনায় নাটোরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ আদেশ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে লালপুরের ইউএনও মো. বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

তবে দুই কর্মকর্তার প্রত্যাহার ও বদলির কারণ সম্পর্কে সরকারি আদেশে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। মামলা দায়েরের পরদিনই এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও বদলির সঙ্গে মামলার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারি বা প্রশাসনিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এ সময় দুই উপজেলায় কয়েকজন সংবাদকর্মীও আহত হন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পাঁচ দিন পর, ১৭ আগস্ট লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী নিজ নিজ থানায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করেন।

দুটি মামলায় মোট ২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

লালপুর থানায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজ রঞ্জু এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মো. হারুন অর রশিদ পাপ্পু।

এ ছাড়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রায়হান কবীর সুইট, যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হানসহ বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নামও মামলায় রয়েছে। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বাগাতিপাড়া থানায় দায়ের করা মামলায় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং ছাত্রদল নেতা সাব্বির হোসেন মুন্নার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নাটোর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, সরকারি সম্পদ ও কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তবে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিএনপির উপজেলা ও পৌর কমিটির শীর্ষ নেতাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, দলীয় নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে মামলায় জড়ানোর পেছনে একটি মহলের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নাটোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ বলেন, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণেই যদি জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে বদলি করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনোবলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাটোর জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ শিশির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে প্রত্যাহার ও বদলি করা হয়েছে।

মামলা দায়েরের পরদিনই জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর বদলি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বদলি বা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে ইউএনও কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিওচিত্র ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে হামলা-ভাঙচুরের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল এবং প্রকৃত দায়ীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ